প্রথমবার্তা,প্রতিবেদকঃ   ইসলামের ইতিহাস সম্বন্ধে সাধারণভাবে আমাদের জ্ঞানের পরিধি আরব সীমান্তের মধ্যেই গন্ডিবদ্ধ থাকতে দেখা যায়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও ইসলাম শিক্ষা কোর্সের অধিকাংশই মূলত আরব বিশ্ব কেন্দ্রিক। তবে হিসেব করলে আমরা দেখব সমগ্র মুসলিম উম্মাহর মাঝে আরবদের সংখ্যা ২০ ভাগের বেশি নয়। আরব ছাড়াও বিভিন্ন ভু-খণ্ডে বিশ্বজুড়ে সুবিস্তৃত সীমানায় মুসলিমগণ ছড়িয়ে আছেন। এবং বিশ্ব জুড়ে রয়েছে আমাদের শাসনের সোনালী ইতিহাস। তন্মধ্য থেকেই এক ভিন্নতর মহান শাসক বারকে খান। এ নিবন্ধে ইনশাআল্লাহ, তাঁরই ইসলাম গ্রহণ ও ভাতিজা কুখ্যাত হালাকু খানের সাথে তাঁর আদর্শের বিরোধ নিয়ে আলোচনা করা হবে।

কে ছিলেন বারকে খান?

বারকে খানের জন্ম তারিখ জানা না গেলেও ধারণা করা হয় তিনি খ্রিস্টীয় ১৩ শতকে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং তিনি বড় ছেলে জোচির দিক থেকে চেঙ্গিস খানের নাতী ছিলেন। আর চেঙ্গিস খান ছিলেন মোঙ্গল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ও কুখ্যাত বর্বর এক নেতা।

 

 

 

 

জোচি নিজেও একজন তুখোড় যোদ্ধা ছিলেন এবং চেঙ্গিস খানের সাথে মধ্য এশিয়া জয়ে বিশাল অবদান রেখেছিলেন। জোচির চার স্ত্রীর  ঘরে ১৪ পুত্র ও ২ কন্যা সন্তান জন্ম নিয়েছিল। চেঙ্গিস খান তার সাম্রাজ্যকে বিভিন্ন অংশে ভাগ করেছিলেন যেগুলোকে খানাত বলা হতো। প্রতিটি খানাতে নিজের এক এক জন পুত্রকে তিনি শাসনকর্তা হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। সে খানাতগুলোর মালিকানা তার মৃত্যুর পরে পুত্রদের মাঝে বণ্টিত হয়।

 

 

 

 

 

যাইহোক, জোচি চেঙ্গিস খানের মৃত্যুর প্রায় ৬ মাস পূর্বে মৃত্যু বরণ করলে তার অংশের খানাতের শাসনভার অর্পিত হয় বড় ছেলে বাতু খানের উপর। বাতু খান শাসিত অঞ্চল পরবর্তীতে গোল্ডেন হর্দ নামে পরিচিতি লাভ করে। বড় ভাই বাতু খানের মৃত্যুর পর বারকে খান গোল্ডেন হর্দের শাসনভার গ্রহণ করেন এবং প্রথম কোন মোঙ্গল শাসক হিসেবে ইসলাম গ্রহণের গৌরবময় সৌভাগ্য লাভে ধন্য হন। তিনি ১২৬৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

 

 

 

 

বারকে খানের ইসলাম গ্রহণ

আধুনিক কাজাকিস্তান থেকে দূরে সারায় জুক নামক শহরে বুখারা থেকে আগত এক বনিক দলের সাথে বারকে খানের সাক্ষাৎ হলে তিনি তাদের ধর্ম সমন্ধে জানতে চান। বিস্তারিত শুনে তিনি সুফি শায়েখের হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। বারকের ভাই তুক-তিমুরও একই সময়ে ভাইয়ের সাথে ইসলামের দীক্ষা লাভ করেন।

 

 

 

 

হালাকু খানের সাথে যুদ্ধ

বারকে খানের ভাতিজা হালাকু খানের দায়িত্ব ছিল উত্তর পারস্যে শাসনকার্য পরিচালনা করা এবং পারস্য থেকে মিসর পর্যন্ত মোঙ্গল সাম্রাজ্য বিস্তারে তার ভাই মউঙ্গকে কে সহযোগিতা করা। ১২৫৬ সালে হালাকু খান প্রায় ১০০,০০০ সেনা নিয়ে যুদ্ধ আরম্ব করে। প্রথমেই তারা ইসমাইলি শিয়াদের দূর্গগুলো দখল করে নেয় এবং তাদের নেতা রুকনুদ্দিনকে বন্দী করে হত্যা করে। এরপর হালাকু খান ইরাকের দিকে এগিয়ে এসে খলিফা মু’তাসিমকে আত্মসমর্পন ও মোঙ্গল সাম্রাজ্যের প্রতি আনুগত্যের আহবান জানালে খলিফা তা প্রত্যাখ্যান করে।হালাকু খান ইরাক আক্রমনের সিদ্ধান্ত নেয় এবং কতক আদর্শ বিক্রেতা বিশ্বাসঘাতক মন্ত্রী ও খলিফা বিরোধী শিয়াদের প্রলোভন দিয়ে নিজের দলে শামিল করে নেয়।

 

 

 

 

 

শিয়া অধ্যুষিত নাজাফ, কারবালা, মসুল ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ন শহরগুলো যুদ্ধ ছাড়াই হালাকু খানের কাছে আত্মসমর্পন করে মোঙ্গল আধিপত্য মেনে নেয়। অবশেষে ১২৫৮ সালের জানুয়ারি মাসে হালাকু খান বাগদাদ আক্রমণ করে এবং মাত্র দুই সপ্তাহের মাঝেই শহরের দখল নিয়ে নেয়। এক সময়ের আলোকিত শহর, জ্ঞান- বিজ্ঞানের শহর, শিল্প ও সাহিত্যের শহর বাগদাদের পতনের সাথে সাথেই খলিফা মুতাসিমকে হত্যা করা হয় এবং সমগ্র শহর জ্বালিয়ে ছাড়খার করে দেয়া হয় সেই সাথে পাল্লা দিয়ে চলে গণহত্যা।

 

 

 

 

 

 

 

 

বাগদাদের এ পতন সংবাদ যখন পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে পৌঁছে, তারা ভয়ে যুদ্ধ না করেই হালাকুর কাছে আত্মসমর্পণ করে। এভাবেই সিরিয়া হালাকু খানের অঞ্চলে পরিণত হয়ে যায়। বারকে খানের কাছে যখন বাগদাদে ঘটে যাওয়া মুসলিম গণহত্যার কথা পৌঁছে, তিনি ক্রোধান্বিত হন এবং হালাকু খানের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের অঙ্গীকার করে বলেন- “সে (হালাকু) মুসলিম জনপদগুলো ধ্বংস করেছে। আল্লাহর সহায়তায় অবশ্যই আমি তার কাছ থেকে প্রতিটি নিরপরাধ লোকের প্রতিশোধ নিব।”

 

 

 

 

 

বারকে খান হামলা করতে পারে এই ভয়ে হালাকু খান সিরিয়ায় ছোট্ট একটি গেরিসন রেখে পারস্যে চলে আসে। ১২৬০ সালের মাঝে অধিকাংশ সিরিয়া অঞ্চল এবং ফিলিস্তিন তাদের করতলগত হলেও তাদের এ বিজয়গাথায় ছন্দপতন ঘটে যখন মামলুক তুর্কি সুলতান সাইফুদ্দিন কুতজ তার সেনাপতি বাইবার্সকে ফিলিস্তিনে প্রেরণ করেন। সেনাপতি রুকন উদ্দিন বাইবার্স মোঙ্গলদের পরাজিত করে তাদের সেনাপ্রধানকে হত্যা করে। এভানেও পশ্চিমে মোঙ্গলদের অগ্রযাত্রা থমকে যায় এবং ফিলিস্তিন ও সিরিয়া আবারো মুসলিম মামলুকদের হাতে চলে আসে।

 

 

 

 

 

 

হালাকু খান চাচ্ছিলেন আবারো নতুন করে সেনা পাঠিয়ে ফিলিস্তিনে পরাজয়ের প্রতিশোধ নেবেন। কিন্তু তা আর সম্ভব হয়নি। কারণ ইতিমধ্যে মুসলিম গণহত্যার অপরাধের প্রতিশোধ নিতে বারকে খান হালাকু খানের ককেসাস অঞ্চলে একের পর এক আক্রমণ করেই যাচ্ছিলেন যেন হালাকু খান তার কাছে নতি স্বীকার করে নেয়। বাগদাদের ঘটনার কারণে একমাত্র হালাকুর বিনাশ ছাড়া বারকে খান অন্য কিছুই মানতে চাচ্ছিলেন না। তাদের দুই জনের এই যুদ্ধ দ্রুতই সে অঞ্চলের আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেয় এবং অন্যান্য খানাতও জোটবদ্ধ হয়ে আক্রমণে আসে। কুবলাই খান হালাকু খানের সাথে জোট বাঁধলে হালাকুর আরেক ভাই আরিকবুক বারকে খানের  সাথে জোটবদ্ধ হয়। যুদ্ধ বর্তমান চায়না ও মঙ্গলীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পরে। যুদ্ধ শুরু হলে আরিকবুক দ্রুতই কুবলাই খার কাছে আত্মসমর্পন করে ফলে হালাকু ও বারকে খান উভয়েই যুদ্ধে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়।

 

 

 

 

 

 

 

পূর্বাঞ্চলীয় খানাতের যে স্বপ্ন আরিকবুকের ছিল তা আর পূরণ হয়নি। তবে মধ্যপ্রাচ্য ও মিশর নিয়ে হালাকুর যে  লোলুপ স্বপ্ন ছিল বারকে খান তা ধ্বংস করে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। এ যুদ্ধ ১২৬৫ সালে হালাকু এবং ১২৬৬ সালে বারকে খানের মৃত্যুর পরও চলছিল।পারস্যে হালাকু খান কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ইলখানাত রাজবংশ ১৩৩৫ সাল পর্যন্ত টিকে ছিল এবং তার উত্তরসূরিরা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। এদিকে বারকে খানের মৃত্যুর পর তার  ভাতিজা মেঙ্গু তিমুর শাসনভার গ্রহণ করে গোল্ডেন হর্দের খান নির্বাচিত হয়। হালাকু খানের বিরুদ্ধে পরিচালিত যুদ্ধে বারকে খান সামগ্রিক জয় না পেলেও মিশরের মামলুক ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে হালাকু খানের দৃষ্টি ও যুদ্ধের মাঠ পূর্বে নিয়ে যেতে বাধ্য করেছিলেন। ফলে আর কোন মুসলিম জনপদকেই বাগদাদের করুণ পরিণতি বরণ করতে হয়নি।