প্রথমবার্তা,প্রতিবেদকঃ অত্যাসন্ন ফযিলতপূর্ণ জিলহজ্জ মাস। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এ মাসেরই প্রথমার্ধে হজ্জ ও কুরবানির মত মহান ইবাদত রেখেছেন। ১০-ই জিলহজ তাঁর বান্দাদের দিয়েছেন ঈদুল আযহা। মুসলমানগণ এ দিনে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কুরবানি করে থাকেন। কুরবানী এমন ইবাদত যার বিধান প্রথম মানব হযরত আদম (আ.) এর যুগ থেকেই চলে আসছে। গুরুত্বপূর্ণ এ ইবাদতের সঠিক ইতিহাস আমাদের জানা থাকা দরকার – যেন আমরা তা পালনে মরমী হই এবং ইতিহাস থেকে অর্জিত শিক্ষা সহিহরূপে ইবাদত পালনে আমাদের পূঁজি হয়। এ নিবন্ধে তাই কুরআন থেকে পৃথিবীর সর্ব প্রথম কুরবানির ইতিহাস আলোচনা করা হবে ইনশাআল্লাহ।

 

 

 

 

 

পৃথিবীর সর্বপ্রথম কুরবানী:

কুরবানীর ইতিহাস খুবই প্রাচীন। সেই আদি পিতা আদম (আ.) এর যুগ থেকেই কুরবানীর বিধান চলে আসছে। আদম (আ.) এর দুই ছেলে হাবিল ও কাবিলের কুরবানী পেশ করার কথা আমরা মহাগ্রন্থ আল-কুরআন থেকে জানতে পারি। মহান আল্লাহ সুবহানাহু তা‘আলা বলেন,

وَٱتۡلُ عَلَيۡهِمۡ نَبَأَ ٱبۡنَيۡ ءَادَمَ بِٱلۡحَقِّ إِذۡ قَرَّبَا قُرۡبَانٗا فَتُقُبِّلَ مِنۡ أَحَدِهِمَا وَلَمۡ يُتَقَبَّلۡ مِنَ ٱلۡأٓخَرِ قَالَ لَأَقۡتُلَنَّكَۖ قَالَ إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ ٱللَّهُ مِنَ ٱلۡمُتَّقِينَ

অর্থঃ আদমের দুই পুত্রের (হাবিল ও কাবিলের) বৃত্তান্ত তুমি তাদেরকে যথাযথভাবে শুনিয়ে দাও, যখন তারা উভয়ে কুরবানী করেছিল, তখন একজনের কুরবানী কবুল হলো এবং অন্যজনের কুরবানী কবুল হলো না। তাদের একজন বলল, ‘আমি তোমাকে অবশ্যই হত্যা করব। অপরজন বলল, ‘আল্লাহ তো সংযমীদের কুরবানীই কবূল করে থাকেন। (সূরা মায়িদা:২৭)

 

 

 

 

 

বিস্তারিত ঘটনাঃ

যখন আদম ও হাওয়া (আ.) পৃথিবীতে আগমন করেন এবং তাদের সন্তান প্রজনন ও বংশ বিস্তার আরম্ভ হয়, তখন হাওয়া (আ.) এর প্রতি গর্ভ থেকে জোড়া জোড়া (জময) অর্থাৎ একসাথে একটি পুত্র ও একটি কন্যা এরূপ জময সন্তান জন্মগ্রহণ করত। কেবল শীস (আ.) ব্যতিরেকে। কারণ, তিনি একা ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন। তখন ভাই-বোন ছাড়া আদম (আ.) এর আর কোন সন্তান ছিল না। অথচ ভাই-বোন পরস্পর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে না।

তাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা উপস্থিত প্রয়োজনের খাতিরে আদম (আ.) এর শরীয়তে বিশেষভাবে এ নির্দেশ জারি করেন যে, একই গর্ভ থেকে যে যমজ পুত্র ও কন্যা জন্মগ্রহণ করবে, তারা পরস্পর সহোদর ভাই-বোন হিসেবে গণ্য হবে। তাদের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক হারাম। কিন্তু পরবর্তী গর্ভ থেকে জন্মগ্রহনকারী পুত্রের জন্য প্রথম গর্ভ থেকে জন্মগ্রহণকারীনি কন্যা সহোদরা বোন হিসেবে গণ্য হবে না। তাদের মধ্যে পরস্পর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া বৈধ।

 

 

 

 

 

সুতরাং সে সময় আদম (আ.) একটি জোড়ার মেয়ের সাথে অন্য জোড়ার ছেলের বিয়ে দিতেন। ঘটনাক্রমে কাবিলের সাথে যে সহোদরা জন্ম নিয়েছিল সে ছিল পরমা সুন্দরী। তার নাম ছিল আকলিমা। কিন্তু হাবিলের সাথে যে সহোদরা জন্ম নিয়েছিল সে দেখতে অতটা সুন্দরী ছিল না। তার নাম ছিল লিওযা। বিবাহের সময় হলে শরয়ী ‘নিয়মানুযায়ী হাবিলের সহোদরা বোন কাবিলের জন্য নির্ধারিত হল। ফলে আদম (আ.) তৎকালীন শরীয়তের আইনের পরিপ্রেক্ষিতে কাবিলের আবদার প্রত্যাখ্যান করলেন এবং তাকে তার নির্দেশ মানতে বললেন। কিন্তু সে মানল না। এবার তিনি তাকে শাসন করলেন। তবুও সে এই শাসনে কান দিল না।

অবশেষে আদম (আ.) হাবিল ও কাবিলের মতভেদ দূর করার উদ্দেশ্যে বললেন, ‘তোমরা উভয়ে আল্লাহর উদ্দেশ্যে কুরবানী পেশ কর, যার কুরবানী গৃহীত হবে, তার সাথেই আকলিমার বিয়ে দেয়া হবে।’ সে সময় কুরবানী গৃহীত হওয়ার একটি সুস্পষ্ট নিদর্শন ছিল যে, আকাশ থেকে একটি অগ্নিশিখা এসে সে কুরবানীকে ভষ্মীভূত করে ফেলত। আর যার কুরবানী কবূল হতো না তারটা পড়ে থকত।

 

 

 

 

 

যাইহোক, তাদের কুরবানীর পদ্ধতি সম্পর্কে যা জানা যায় তা হলো- কাবিল ছিল চাষী। তাই তিনি গমের শীষ থেকে ভাল ভালগুলো বের করে নিয়ে বাজেগুলোর একটি আটি কুরবানীর জন্য পেশ করল। আর হাবিল ছিল পশুপালনকারী। তাই সে তার জন্তুর মধ্যে থেকে সবচেয়ে উৎকৃষ্ট একটি দুম্বা কুরবানীর জন্য পেশ করল। এরপর নিয়মানুযায়ী আকাশ থেকে অগ্নিশিখা এসে হাবিলের কুরবানীটি ভষ্মীভুত করে দিল। [ফতহুল ক্বাদীরের বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, হাবিলের পেশকৃত দুম্বাটি জান্নাতে উঠিয়ে নেয়া হয় এবং তা জান্নাতে বিচরণ করতে থাকে। অবশেষে ইসমাঈল যাবিহুল্লাহ (আ.) কে ঐ দুম্বাটি পাঠিয়ে বাঁচিয়ে দেয়া হয়।] আর কাবিলের কুরবানী যথাস্থানেই পড়ে থাকল।

অর্থাৎ হাবিলেরটি গৃহীত হলো আর কাবিলেরটি হলো না। কিন্তু কাবিল এ আসমানী সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারল না। এ অকৃতকার্যতায় কাবিলের দুঃখ ও ক্ষোভ আরো বেড়ে গেল। সে আত্মসংবরণ করতে পারল না এবং প্রকাশ্যে তার ভাইকে বলল, ‘আমি অবশ্যই তোমাকে হত্যা করব। হাবিল তখন ক্রোধের জবাবে ক্রোধ প্রদর্শন না করে একটি মার্জিত ও নীতিগত বাক্য উচ্চারণ করল, এতে কাবিলের প্রতি তার সহানুভূতি ও শুভেচ্ছা ফুটে উঠেছিল। হাবিল বলেছিল, ‘তিনি মুত্তাক্বীর কর্মই গ্রহণ করেন। সুতরাং তুমি তাক্বওয়ার কর্মই গ্রহণ করো। তুমি তাক্বওয়া অবলম্বন করলে তোমার কুরবানীও গৃহীত হতো। তুমি তা করোনি, তাই তোমার কুরবানী প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। এতে আমার দোষ কোথায়?…..তবুও এক পর্যায়ে কাবিল হাবিল কে হত্যা করে ফেলল। (তাফসীর ইবনু কাসীর, দুররে মনসূর, ফতহুল বায়ান, ৩/৪৫ ও ফতহুল ক্বাদীর, ২/২৮-২৯)

 

 

 

 

 

কুরআনে বর্ণিত হাবিল ও কাবিল কর্তৃক সম্পাদিত কুরবানীর এ ঘটনা থেকেই মূলত কুরবানীর ইতিহাসের গোড়াপত্তন হয়েছে। এ ঘটনায় আমরা দেখতে পেলাম যে, কুরবানী দাতা ‘হাবিল’, যিনি মনের ঐকান্তিক আগ্রহ সহকারে আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি লাভের জন্যে একটি সুন্দর দুম্বা কুরবানী হিসেবে পেশ করেন। ফলে তার কুরবানী কবূল হয়। পক্ষান্তরে কাবিল, সে অমনোযোগী অবস্থায় কিছু খাদ্যশস্য কুরবানী হিসেবে পেশ করে। ফলে তার কুরবানী কবূল হয়নি। সুতরাং প্রমাণিত হলো কুরবানী মনের ঐকান্তিক আগ্রহ ছাড়া কবূল হয় না। তারপর থেকে বিগত সকল উম্মতের উপরে এটা জারি ছিল। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

وَلِكُلِّ أُمَّةٖ جَعَلۡنَا مَنسَكٗا لِّيَذۡكُرُواْ ٱسۡمَ ٱللَّهِ عَلَىٰ مَا رَزَقَهُم مِّنۢ بَهِيمَةِ ٱلۡأَنۡعَٰمِۗ فَإِلَٰهُكُمۡ إِلَٰهٞ وَٰحِدٞ فَلَهُۥٓ أَسۡلِمُواْۗ وَبَشِّرِ ٱلۡمُخۡبِتِينَ

অর্থঃ “আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্যে কোরবানী নির্ধারণ করেছি, যাতে তারা আল্লাহর দেয়া চতুস্পদ জন্তু যবেহ কারার সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে। অতএব তোমাদের আল্লাহ তো একমাত্র আল্লাহ সুতরাং তাঁরই আজ্ঞাধীন থাক এবং বিনয়ীগণকে সুসংবাদ দাও।” (সূরা হাজ্জ:৩৪)

 

 

 

 

 

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা নাসাফী ও যামাখশারী বলেন, ‘আদম (আ.) থেকে মুহাম্মাদ (সা.) পর্যন্ত প্রত্যেক জাতিকে আল্লাহ তা‘আলা তার নৈকট্য লাভের জন্য কুরবানীর বিধান দিয়েছেন। (তাফসীরে নাসাফী ৩/৭৯; কাশশাফ, ২/৩৩)

আদম (আ.) এর যুগে তারই পুত্র কাবিল ও হাবিলের কুরবানীর পর থেকে ইবরাহীম (আ.) পর্যন্ত কুরবানী চলতে থাকে। প্রকৃতপক্ষে কুরবানীর ইতিহাস ততটা প্রাচীন যতটা প্রাচীন দ্বীন-ধর্ম অথবা মানবজাতির ইতিহাস। মানবজাতির জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে যত শরীয়ত নাযিল হয়েছে, প্রত্যেক শরীয়তের মধ্যে কুরবানীর বিধান জারি ছিল। প্রত্যেক উম্মতের ইবাদতের এ ছিল একটি অপরিহার্য অংশ।
ইতিহাসের এ ঘটনায় আমাদের জন্য যে শিক্ষা রয়েছে, তা হল-

 

 

 

 

 

১. আল্লাহ যা আমার জন্য চেয়েছেন, তাতেই নিজেকে সন্তুষ্ট রাখা। এর মাঝেই আল্লাহ কল্যাণ রেখেছেন। কাবিল যদি আল্লাহর বিধানের কাছে সমর্পিত হয়ে লিওযাকে গ্রহণ করে নিত, আল্লাহ হয়তো তার জন্য উত্তম কোন পথ খুলে দিতেন – যাতে তার আত্মা প্রশান্ত হতো। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তাঁর উপর ভরসার পর আল্লাহ অকল্পনীয়ভাবে বান্দাকে সন্তুষ্ট করেছেন – ইসলামে এর নজির অনেক।

২. কুরবানি করতে হবে সাধ্যের মধ্যে উৎকৃষ্ট পশু দিয়ে। কেননা কাবিল এক্ষেত্রে সঙ্কীর্ণতার পরিচয় দিয়ে অকৃতকার্য হয়েছে, তার কুরবানি আল্লাহ কবুল করেননি।

৩. কুরবানি করতে হবে একমাত্র আল্লাহর জন্য। উপরের বর্ণনায় স্পষ্ট যে হাবিলের কুরবানিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি উদ্দেশ্য ছিল ফলে সে উৎকৃষ্ট পশু পেশ করেছে। আর কাবিলের উদ্দেশ্য ছিল দুনিয়াবি ও নিকৃষ্ট – উপরন্তু সে অনুত্তম শস্যই কুরবানির জন্য পেশ করেছে, আল্লাহ তা কবুল করেননি।

এই বিভাগের আরো খবর :

‘লাইলাতুল কদরে’ কি কি ইবাদত করবেন?
রোজার সময় ঋতুস্রাব নিয়ে নারীদের লুকোচুরি কেনো?
জেনে নিন, কেন ৯ বছর বয়সী আয়শা(রাঃ)কে মুহাম্মদ(সাঃ) বিয়ে করেন?
রাত্রে ঘুম ভেঙ্গে গেলে এই যিকির করলে যা প্রার্থনা করবেন তাই কবুল হবে ইনশা আল্লাহ
এই তিন শ্রেণীর নারীকে বিয়ে করলে সংসারে আল্লাহর গজব নেমে আসবে
পবিত্র জুম্মার দিনের আমল ও বরকত
দুনিয়ালোভী সরকারের অনুগত আলেম
চীনে সবচেয়ে জনপ্রিয় ধর্ম হচ্ছে ইসলাম
রোজা রাখলে যেভাবে খোদাভীতি অর্জন হয়
কৃপণতা : সফল জীবনের অন্তরায়
সপ্তাহের সাত দিনের মধ্যে জুমার দিন হচ্ছে শ্রেষ্ঠ দিন
মক্কা বিজয় ও একটি প্রেমের সমাধি
প্রথম মোঙ্গলীয় মুসলিম শাসক বারকে খানের ইসলাম গ্রহণ
জেনে নিন কিয়ামতের আগে যে তিনটি স্থানে বিশাল আকারের ভূমিকম্প হবে