প্রথমবার্তা,প্রতিবেদকঃ  সমাজবদ্ধ জীবনে পথের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। আর সেই পথটি নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত থাকবে, নির্ভয়ে নিশ্চিন্ত মনে নিজের জীবন, সম্মান ও সম্ভ্রম রক্ষা করে হেঁটে যাওয়া যাবে- এটি একজন পথিকের অধিকার। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর কিংবা বিত্তবান ব্যক্তি থেকে খেটে খাওয়া দিনমজুর পর্যন্ত সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকেই জীবনের তাগিদে পথে আসতে হয়। নিরাপদ পথের অধিকার তাই সকলের।

 

 

 

 

 

এ অধিকার সংরক্ষণের সুন্দর ও স্থির মানসিকতা যেমন সমাজের সকল মানুষকে রাখতে হবে, তেমনি রাষ্ট্রকেও বাস্তবমুখী আইন ও কার্যক্ষেত্রে এর যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে এ অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। নয়তো দায়িত্বের অবহেলায় একটি প্রাণেরও যদি অপমৃত্যু ঘটে, এর দায় হন্তারকের সাথে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দায়িত্বশীলের কাঁধ পর্যন্ত বর্তাবে। কেননা হাদিস শরীফে এসেছে- ‘জেনে রাখো, তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং নিজ নিজ অধীনস্থের বিষয়ে তোমাদের প্রত্যেকেই জিজ্ঞাসিত হবে। অতঃপর দেশের শাসক জনগণের উপর দায়িত্বশীল। সে তার দায়িত্বশীলতার ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে…।’ (বুখারী : ৮৯৩; মুসলিম: ১৮২৯)

 

 

 

 

 

পথের অধিকার সম্পর্কে হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত একটি প্রসিদ্ধ হাদিসে এসেছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,إِيَّاكُمْ وَالْجُلُوسَ بِالطُّرُقَاتِ، فَقَالُوا يَا رَسُولَ اللهِ! مَا لَنَا مِنْ مَجَالِسِنَا بُدٌّ، نَتَحَدَّثُ فِيهَا، فَقَالَ: إِذَا أَبَيْتُمْ إِلاَّ الْمَجْلِسَ، فَأَعْطُوا الطَّرِيقَ حَقَّهُ، قَالُوا: وَمَا حَقُّ الطَّرِيقِ يَا رَسُولَ اللهِ! قَالَ: غَضُّ الْبَصَرِ، وَكَفُّ الأَذَى، وَرَدُّ السَّلاَمِ، وَالأَمْرُ بِالْمَعْرُوفِ وَالنَّهْيُ عَنِ الْمُنْكَرِ .

 

 

 

 

 

‘তোমরা পথে বসা থেকে বিরত থেকো। সাহাবীগণ বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! কথাবার্তা বলার জন্যে যে আমরা পথে না বসে পারি না। রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, যদি তোমাদের পথে বসতেই হয় তাহলে পথের হক আদায় করো। তারা বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! পথের হক কী? তিনি বললেন, ‘দৃষ্টি অবনত রাখা, কাউকে কষ্ট না দেয়া, সালামের উত্তর দেয়া, সৎ কাজের আদেশ করা এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করা।’ (সহীহ বুখারী, হাদীস ৬২২৯)

 

 

 

 

 

হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকেও হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। উপরোক্ত বিষয়গুলো ছাড়াও তার বর্ণিত হাদীসে আরও রয়েছে وَتَشْمِيتُ الْعَاطِسِ، وَإِرْشَادُ السَّبِيل ‘এবং হাঁচির জবাব দেয়া এবং (মানুষকে) পথ দেখিয়ে দেওয়া।’ (মুসনাদে আবু ইয়ালা, হাদীস ৬৬০৩)

 

 

 

 

হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বর্ণিত হাদীসে আরও রয়েছে- وَتُغِيثُوا الْمَلْهُوفَ وَتَهْدُوا الضَّالَّ ‘এবং তোমরা নির্যাতিত ব্যক্তিকে সাহায্য করবে ও পথ-সন্ধানীকে পথের সন্ধান দেবে।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৪৮১৯)

 

 

 

 

 

 

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বর্ণনা করেছেন- … وَأَعِينُوا عَلَى الْحمُولَةِ … ‘এবং তোমরা বোঝা উঠিয়ে দিয়ে সহযোগিতা করো।’ (মুসনাদে বাযযার, হাদীস ৫২৩২)হযরত আবু তালহা রা. থেকে বর্ণিত হাদীসে আছে- … وحسن الكلام … ‘এবং সুন্দর কথা বলো।’ (সহীহ মুসলিম, হাদীস ২১৬১)

 

 

 

 

 

উপরোক্ত হাদীসগুলোতে প্রিয় নবীজী সা. পথের যে অধিকারগুলো বর্ণনা করেছেন তা আমরা এভাবে উপস্থাপন করতে পারি: ১. দৃষ্টি অবনত রাখা: দৃষ্টিকে বলা হয় শয়তানের একটি বিষাক্ত তীর। এই দৃষ্টির মাধ্যমেই সূচনা হয় নারী-পুরুষের নেতিবাচক সম্পর্কের মনোভাব। এর ফলশ্রুতিতে ধীরে ধীরে বিনষ্ট হয় পারিবারিক ও সামাজিক শান্তি। পথে চলার অধিকার নারী-পুরুষ সকলেরই রয়েছে। পথে বের হতে হলে নারীকে কিভাবে বের হতে হবে, কেমন পোশাক পরতে হবে তা একটি স্বতন্ত্র বিষয়।

 

 

 

 

 

তবে কোনো সম্ভ্রান্ত নারী যখন পথ চলে তখন কোনো পুরুষ তার দিকে তাকিয়ে থাকাকে সে নিজের জন্যে সম্ভ্রমহানিকর মনে করে। পরিচিত কিংবা অপরিচিত কোনো পুরুষ যদি তাকিয়ে থাকে তাহলে অনেক নারী পর্দাবৃত থাকা সত্ত্বেও পথ চলতে অস্বস্তি বোধ করে। রাসূলুল্লাহ সা. এজন্যেই নির্দেশ দিয়েছেন- ‘পথের পাশে বসলে দৃষ্টি অবনত রাখো’। আর পবিত্র কুরআনে তো নারী-পুরুষ উভয় শ্রেণিকে ভিন্ন ভিন্নভাবে দৃষ্টি অবনত রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

 

 

 

 

 

আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেছেন- قُلْ لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ‘হে নবী, তুমি মুমিন পুরুষদের বলে দাও, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে…।’ (সূরা মুমিনুন : ৩০)وَقُلْ لِلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ.‘আর হে নবী, তুমি মুমিন নারীদের বলে দাও, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে…।’ (সূরা মুমিনুন : ৩১)

 

 

 

 

 

২. কাউকে কষ্ট না দেয়া: এ বিষয়টি অত্যন্ত ব্যাপক। প্রতিটি মানুষের প্রাণ, সম্পদ, সম্ভ্রম সবকিছুই সম্মানের পাত্র। অন্যায়ভাবে কারও জানমাল ও ইজ্জত-সম্মানের ওপর হামলা করা ইসলামে নিষিদ্ধ। অন্যায়ভাবে কাউকে কোনোরূপ কষ্ট দেয়া যাবে না, চাই সেটা শারীরিক বা মানসিক হোক, ধন-সম্পদ বা মান-সম্মানের ওপরেই হোক। এক্ষেত্রে কুরআনে কারীমের সুস্পষ্ট নির্দেশনা এসেছে।আল্লাহ তা’আলা বলেছেন,وَالَّذِينَ يُؤْذُونَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ بِغَيْرِ مَا اكْتَسَبُوا فَقَدِ احْتَمَلُوا بُهْتَانًا وَإِثْمًا مُبِينًا.

 

 

 

 

 

‘যারা মুমিন নারী-পুরুষদের পীড়া দেয়, এমন কোনো অপরাধের বিষয়ে যা তারা করেনি, তারা তাহলে অপবাদ ও সুস্পষ্ট পাপের বোঝা বহন করে নিল।’ (সূরা আহযাব : ৫৮)মুসলমানদের কোনোরূপ কষ্ট না দেয়া- এ বিষয়টিকে তো রাসূলুল্লাহ (সা.) একজন মুসলমানের পরিচয় হিসেবেই উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন- الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ

 

 

 

 

 

অর্থাৎ ‘মুসলমান তো সেই, যার মুখ ও হাত থেকে অন্য সকল মুসলমানেরা নিরাপদ থাকে।’ (সহীহ বুখারী, হাদীস ১০)প্রয়োজনীয় কথা বলার জন্যে হোক কিংবা বিশ্রামের জন্যে হোক, পথের পাশে যদি কেউ বসে তাহলে অবশ্যই তাকে এমন সব কাজকর্ম থেকে বিরত থাকতে হবে, যাতে কোনো পথিক কষ্ট পেতে পারে। শুধু মুসলমান নাগরিকই নয়, নিরাপদ পথের অধিকার মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সকল মানুষের। এমনকি অন্য কোনো প্রাণীকেও তো অনর্থক কষ্ট দিতে নিষেধ করা হয়েছে।

 

 

 

 

 

৩. সালামের উত্তর দেয়া: একজন মুসলমান যখন আরেকজন মুসলমানকে সালাম দেয় তখন সেই সালামের উত্তর দেয়া ওয়াজিব। এই উত্তর পাওয়া সালামপ্রদানকারীর অধিকার। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,حَقُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ خَمْسٌ: رَدُّ السَّلاَمِ وَعِيَادَةُ الْمَرِيضِ، وَاتِّبَاعُ الْجَنَائِز،ِ وَإِجَابَةُ الدَّعْوَةِ، وَتَشْمِيتُ الْعَاطِسِ.‘পাঁচটি বিষয় এক মুসলমানের ওপর আরেক মুসলমানের অধিকার- সালামের উত্তর দেয়া, অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যাওয়া, জানাযায় শরিক হওয়া, দাওয়াত গ্রহণ করা এবং হাঁচি দিয়ে আলহামদুলিল্লাহ বললে এর উত্তরে ইয়ারহামুকাল্লাহ বলা।’ (সহীহ বুখারী, হাদীস ১২৪০)

 

 

 

 

পরস্পর দেখা-সাক্ষাতে মুসলিমরা সালামের মাধ্যমেই অভিবাদন জানায়। একে অন্যের জন্যে আল্লাহর দরবারে শান্তি ও রহমত কামনা করে। আর পারস্পরিক এই কল্যাণ কামনা তাদের মাঝে রোপন করে ভালোবাসা ও আন্তরিকতার বীজ। হাদীস শরীফেও রাসূলুল্লাহ (সা.) সালামকে পারস্পরিক ভালোবাসা ও ঘনিষ্ঠতাকে আরও ঘনিষ্ঠ করে তোলার মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করেছেন। হাদীসটি হযরত আবু হুরায়রা রা. কর্তৃক বর্ণিত-لاَ تَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ حَتَّى تُؤْمِنُوا، وَلاَ تُؤْمِنُوا حَتَّى تَحَابُّوا، أَوَلاَ أَدُلُّكُمْ عَلَى شَىْءٍ إِذَا فَعَلْتُمُوهُ تَحَابَبْتُمْ أَفْشُوا السَّلاَمَ بَيْنَكُمْ.

 

 

 

 

 

তোমরা যতক্ষণ ঈমান না আনবে ততক্ষণ বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে না, আর যতক্ষণ পরস্পরে ভালোবাসা সৃষ্টি হবে না ততক্ষণ তোমাদের ঈমানও পূর্ণ হবে না। আমি কি তোমাদের এমন একটি আমলের কথা বলে দেব না, যা করলে তোমরা পরস্পরকে ভালোবাসবে? নিজেদের মাঝে সালামের প্রচলন ঘটাও। (সহীহ মুসলিম, হাদীস ৫৪)সালামের উত্তর দেয়াকে রাসূলুল্লাহ (সা.) পথের হক হিসেবে গণ্য করেছেন। পথের পাশে বসে থাকা ব্যক্তিকে পথিক যখন সালাম দেবে, তখন যেন সে পথিকের সালামের উত্তর দেয়।

 

 

 

 

 

৪. সৎ কাজের আদেশ করা এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করা সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করা এই উম্মতের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। পথে যদি কোনো অন্যায় কাজ চোখে পড়ে তখন সাধ্যমতো বাধা দিতে হবে এবং সৎ কাজের আদেশ করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রত্যেকেই নিজ নিজ সামর্থ্যরে প্রতি লক্ষ রাখবে এবং নিজের সামর্থ্যটুকু যথাযথ ব্যবহারের প্রতিও যত্নবান হবে। এটাই হাদীসের শিক্ষা।রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন,مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ، وَذَلِكَ أَضْعَفُ الإِيمَانِ. ‘তোমাদের কেউ যখন কোনো অন্যায় কাজ দেখে তখন যেন সে নিজ হাতে তা প্রতিহত করে। যদি তা তার পক্ষে সম্ভব না হয় তাহলে মুখে বাধা দেবে। যদি তাও না পারে তাহলে অন্তরে তা ঘৃণা করবে। আর এটিই ঈমানের সর্বনি স্তর।’ (সহীহ মুসলিম, হাদীস ৪৯)

 

 

 

 

 

৫. হাঁচির জবাব দেয়া: হাঁচির পর আলহামদুলিল্লাহ বলা সুন্নত। তখন যে আলহামদুলিল্লাহ বলা শুনবে, তার কর্তব্য ‘ইয়ারহামুকাল্লাহ’ বলা। এর মাধ্যমে যে হাঁচি দিল তার জন্যে কল্যাণের দোয়া করা হয়। এটিই হাঁচির জবাব। পথচলার সময় কোনো পথিক যদি হাঁচি দিয়ে আলহামদুলিল্লাহ বলে আর পথের পাশে বসে থাকা ব্যক্তি যদি তা শোনে তাহলে তার কর্তব্য ইয়ারহামুকাল্লাহ (আল্লাহ তোমার ওপর রহম করুন) বলে তার কল্যাণ কামনা করা। উপরে সালামের উত্তর দেয়া প্রসঙ্গে যে হাদীসটি উল্লেখ করা হয়েছে তাতে হাঁচির জবাবের বিষয়টিও রয়েছে। এ প্রসঙ্গে আরেকটি হাদীস, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, এক মুসলমানের ওপর আরেক মুসলমানের ছয়টি হক ও অধিকার রয়েছে।

 

 

 

 

 

 

 

সাহাবায়ে কেরাম জানতে চাইলেন- সেগুলো কী?রাসূলুল্লাহ সা. বললেন,إِذَا لَقِيتَهُ فَسَلِّمْ عَلَيْهِ، وَإِذَا دَعَاكَ فَأَجِبْهُ، وَإِذَا اسْتَنْصَحَكَ فَانْصَحْ لَهُ، وَإِذَا عَطَسَ فَحَمِدَ اللهَ فَسَمِّتْهُ، وَإِذَا مَرِضَ فَعُدْهُ وَإِذَا مَاتَ فَاتَّبِعْهُ.‘তুমি যখন তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে তখন তাকে সালাম দেবে, যখন সে তোমাকে নিমন্ত্রণ জানাবে তখন নিমন্ত্রণ গ্রহণ করবে, যখন সে তোমার নিকট উপদেশ চাইবে তখন তাকে উপদেশ দেবে, যখন সে হাঁচি দিয়ে আলহামদুলিল্লাহ বলবে তখন (ইয়ারহামুকাল্লাহ বলে) তার জন্যে কল্যাণ প্রার্থনা করবে, সে অসুস্থ হয়ে পড়লে দেখতে যাবে আর মৃত্যু বরণ করলে তার জানাযায় শরীক হবে।’ (সহীহ মুসলিম, হাদীস ২১৬২)

 

 

 

 

 

৬. সুন্দর কথা বলা এবং পথ দেখিয়ে দেয়া: কোন নতুন গন্তব্যে পথ না চেনা বা চলতে চলতে পথ হারিয়ে ফেলা একটি সাধারণ বিষয়। পথিক তখন পথে থাকা মানুষদের কাছেই নিজ গন্তব্যের ঠিকানা জানতে চায়। যারা পথ চেনে, রাস্তার পাশে বসে থাকে, তাদের কাছে এটি পথিকের অধিকার। কেউ পথ জানতে চাইলে তাকে তার পথটি দেখিয়ে দিতে হবে। পাশাপাশি তার সঙ্গে কৃত আচরণও যেন সুন্দর হয়, হাদীস শরীফে একেও পথের হক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। গন্তব্যের পথটি জানা থাকলে তা দেখিয়ে দিতে হবে হৃদ্যতা ও উদারতার সঙ্গে, আর জানা না থাকলেও তার সঙ্গে কোমল আচরণ করতে হবে। এটাই এ হাদীসের দাবি। কর্কশ ও অসুন্দর আচরণ করা যাবে না কিছুতেই।

 

 

 

 

 

 

এক হাদীসে এ পথ দেখানোকে ‘সদকা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, وَإِرْشَادُكَ الرَّجُلَ فِي أَرْضِ الضَّلاَلِ لَكَ صَدَقَةٌ ‘তুমি কাউকে তার অচেনা পথ দেখিয়ে দিলে, এটি তোমার জন্যে একটি সদকা।’ (জামে তিরমিযী, হাদীস ১৯৫৬)আরেক হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,مَنْ مَنَحَ مَنِيحَةَ لَبَنٍ أَوْ وَرِقٍ أَوْ هَدَى زُقَاقًا كَانَ لَهُ مِثْلَ عِتْقِ رَقَبَةٍ.‘যে ব্যক্তি কোনো দুগ্ধবতী বকরি দান করে অথবা কাউকে ঋণস্বরূপ অর্থ প্রদান করে কিংবা কাউকে পথ দেখিয়ে দেয় সে একটি গোলাম আজাদ করার সওয়াব লাভ করবে।’ (জামে তিরমিযী, হাদীস ১৯৫৭)

 

 

 

 

 

৭. নির্যাতিত ব্যক্তিকে সাহায্য করা: একজন মানুষ যখন বিপদে পড়ে তখন অপরাপর মানুষেরা তার সহযোগিতায় এগিয়ে আসবে- এটি মানবতা ও নৈতিকতার দাবি। রাসূলুল্লাহ (সা.) এর পবিত্র হাদিসে এটি আলোচিত হয়েছে পথের অধিকার হিসেবে। কোনো পথিকের ওপর যদি অন্যায় হয়, কোনো সন্ত্রাসী কিংবা ছিনতাইকারীর আক্রমনে কোনো পথিকের জীবন, সম্ভ্রম বা সম্পদ ঝুঁকির মুখে পড়ে, তখন পথের পাশে থাকা ব্যক্তিদের এগিয়ে আসতে হবে এই নির্যাতিতের সহযোগিতায়। আক্রান্ত ব্যক্তির জাত-ধর্ম-বর্ণ এক্ষেত্রে কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়। সে একজন পথিক, নিরাপদে পথ চলার অধিকার তার আছে- এটিই মূল কথা। অন্যায় মোকাবেলার সামর্থ্য থাকা সত্তেও কাউকে নির্যাতিত হতে দেখেও না দেখা কিংবা নীরবতা অবলম্বন করা প্রকারান্তরে অন্যায়কে সমর্থন ও সহযোগিতা করারই শামিল।

 

 

 

 

 

হাদীস শরীফের ভাষ্য, নির্যাতিত ব্যক্তির পাশে দাঁড়িয়ে অন্যায় থামিয়ে দেয়া- এতে জালেম-মজলুম উভয়কেই সহযোগিতা করা হয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তুমি তোমার ভাইকে সাহায্য করো, সে জালেম হোক আর মজলুম হোক। সাহাবায়ে কেরাম জানতে চাইলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! মজলুমকে তো আমরা সাহায্য করব ঠিক, কিন্তু জালেমকে সাহায্য করব কিভাবে?রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন تأخذ فوق يديه ‘তুমি তার হাত ধরে ফেলবে।’ (অর্থাৎ তাকে তার অন্যায় থেকে ফিরিয়ে রাখাটাই তার জন্যে সহযোগিতা।) (সহীহ বুখারী, হাদীস ২৪৪৪)

 

 

 

 

 

৮. বোঝা উঠিয়ে দিয়ে সহযোগিতা করা: একজন মানুষ কখনো ক্লান্ত হয়ে বোঝাটি কিছু সময় নামিয়ে রাখতে পারে। কোন বোঝা মাথা বা বাহন থেকেও পড়ে যেতে পারে। ক্লান্ত সে পথিক তখন একজন মানুষের অপেক্ষায় থাকে, যে তার বোঝাটি ওঠাতে সহযোগিতা করবে। পথের পাশে বসতে হলে পথিকের এ জাতীয় সহযোগিতায় এগিয়ে আসতে হবে। এটিও পথ ও পথিকের অধিকার।

 

 

 

 

 

মোটকথা, পথের সৃষ্টিই পথিকের জন্যে। তাই পথে বসে এমন কোনো কাজ করা যাবে না, যাতে পথিকের পথচলা বিঘ্নিত হতে পারে। বরং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে পথিকের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। সামর্থ্য উজাড় করে তার সাহায্যে এগিয়ে আসতে হবে। এও মনে রাখতে হবে, প্রথমোক্ত হাদীসটিতে পথের পাশে বসার যে বিষয়টি উল্লেখিত হয়েছে সেটি কেবলই একটি প্রাসঙ্গিক বিষয়। হাদীসটির ভাষ্য হলো, যদি পথের পাশে তোমাকে বসতেই হয় তাহলে পথের এ অধিকারগুলো আদায় করো।

 

 

 

 

 

এর অর্থ এই নয় যারা পথে পথে বসে থাকবে তারাই কেবল পথের এ অধিকারসমূহ আদায় করবে। বরং এ অধিকারসমূহ পথ ও পথিকের। যারা কথাবার্তা বলা কিংবা অন্য কোনো প্রয়োজনে পথের পাশে বসবে তারা যেমন এ অধিকারসমূহ আদায়ে সচেষ্ট হবে, তেমনি যারা পথিক কিংবা পথের পাশের দোকানদার, তাদেরকেও এ বিষয়গুলোর প্রতি যত্নবান হতে হবে। এটিই ইসলামের আদর্শ। নিজেকে ইসলামের সত্যিকার অনুসারী হিসেবে পরিচয় দিতে হলে এ আদর্শ আমাদের ধারণ করতেই হবে। আল্লাহ তাওফিক দান করুন।