প্রথমবার্তা,প্রতিবেদকঃ  হজই একমাত্র ইবাদত, যার নিয়ত করার সময়ই আল্লাহ তা’আলার কাছে সহজতা ও কবুলের দু’আ করা হয়। অন্যান্য ইবাদত থেকে হজের আমলটি যে কঠিন তা এ থেকেই স্পষ্ট। হজের সঠিক মাসআলার জ্ঞান যেমন জরুরি, তেমনি তা আদায়ের কৌশল এবং পূর্ব অভিজ্ঞতার আলোকে করণীয় বিষয়গুলোর প্রতি পূর্ণ খেয়াল রাখাও জরুরি।

 

 

 

 

 

হজে যে সকল ভুল হতে দেখা যায়, তা সাধারণত উদাসীনতার কারণেই হয়ে থাকে। তাই এ নিবন্ধে সচরাচর ঘটে থাকে এমন কিছু ভুল নিয়ে গত দুই পর্বে আলোচনা করা হয়েছে, আজ শেষ পর্ব প্রকাশ করা হচ্ছে। উদ্দেশ্য- যেন হাজীগণ এ সকল ভুল-ভ্রান্তি থেকে বেঁচে সুষ্ঠুভাবে হজ আদায়ে সক্ষম হন। আল্লাহ তা’আলা তাওফিক দান করুন।

 

 

 

 

২৬. হজ্বের ইহরামের স্থান নিয়ে বিভ্রান্তি- হারামে অবস্থানকারীদের অনেকে হজের এহরাম মসজিদে হারামে গিয়ে করাকে জরুরি মনে করেন, অথচ সেখানে এহরাম বাঁধা জরুরি নয়, উত্তম। হজের এহরাম হোটেল বা অবস্থানের জায়গাতেও করা যাবে।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস ১৫৯৩১, ১৫৯৩৩; মানাসিক মোল্লা আলী কারী পৃ. ১৮৭; গুনইয়াতুন নাসিক পৃ.২১৬; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২৩৯; রদ্দুল মুহতার ২/৪৭৮

 

 

 

 

 

 

২৭. মিনার দ্বন্দ-কলহ: মূলত ‘মিনা’ থেকে যেহেতু হজের কাজ শুরু হয় তাই শয়তান সুযোগে থাকে যে, হজের শুরুতেই এমন কাজ করিয়ে দিবে যার দ্বারা হজের রূহ নষ্ট হয়ে যায়। যেমন-মিনায় অবস্থানের জায়গা নিয়ে হাজীদের মধ্যে ঝগড়া এবং গালিগালাজ পর্যন্ত হতে দেখা যায়। আর এটা যেন মিনাতে হতেই হবে। ওই মাঠেও কি আরামে শোয়ার জন্য ঝগড়া করতে হবে? এটা কি অসম্ভব যে, নিজেদের বিছানা তাঁবুর বাইরে রেখে অন্য ভাইদেরকে ভালোভাবে জায়গা করে দিব। সৌদির অনেক হাজি রাস্তাতেই মিনার দিনগুলো অতিবাহিত করে দেন। আর আমরা সেখানে ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হই। অথচ পরবর্তী সময়ে দেখা যায়, তাঁবুর ভেতরেই সকলের ভালোভাবে জায়গা হয়ে যায়। কুরআন মজীদে এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা এসেছে।

 

 

 

 

 

ইরশাদ হয়েছে-(তরজমা) ‘হজের সময় কোনো ঝগড়া-বিবাদের অবকাশ নেই।’ তাই এ ব্যাপারে খুব সাবধান থাকা উচিত। অনেক বুযুর্গই মিনাতে শয়তানের ফাঁদ থেকে বাঁচার জন্য খুব সতর্ক করে থাকেন।-সহীহ বুখারী ১/২৪৫; মানাসিক ১১৭; গুনইয়াতুন নাসিক পৃ. ৮৫; আলমুগনী ইবনে কুদামা ৫/১১২; আদ্দুররুল মুখতার ২/৪৮৭আরাফা সংক্রান্ত ভুল-ভ্রান্তি-

 

 

 

 

 

 

 

 

 

২৮. তালবিয়া পড়া সংক্রান্ত ভুল-ভ্রান্তি: মিনা, আরাফা ও মুজদালিফায় মানুষ দলে দলে চলতে থাকে, অবস্থান করতে থাকে। কিন্তু খুব কমই সশব্দে তালবিয়া পড়তে শোনা যায়। অথচ এহরাম বাঁধার পর থেকে ১০ তারিখ পাথর মারার আগ পর্যন্ত সশব্দে তালবিয়া পড়া গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত। এ সময় অন্যান্য জিকিরের চেয়ে এটিই অধিক পরিমাণে করতে বলা হয়েছে। আর সশব্দে পড়লেও এক-দু’বার পড়ে থেমে যায়। অথচ তালবিয়া যখন পড়বেন তখন একত্রে তিনবার পড়া মুস্তাহাব।-সহীহ মুসলিম ১/৪১৫; মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস ১৪১৭৮; মানাসিক মোল্লা আলী কারী পৃ. ১০৩; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২২৩, ১/২৩৫; আলমুগনী ইবনে কুদামা ৫/১০১; আদ্দুররুল মুখতার ২/৪৯১, ২/৪৮৩-৪৮৪

 

 

 

 

 

 

২৯. মসজিদে নামিরার মেহরাবে ও তার পাশে অবস্থান করা: মসজিদে নামিরার মেহরাবসহ সামনের কিছু অংশ ‘উকুফের’ জায়গা নয়। কিন্তু অনেক হাজি সাহেবকে আরাফার পুরো সময়ই সেখানে অবস্থান করতে দেখা যায়। আবার অনেক হাজি সাহেব আরাফার বাইরেও অবস্থান করে থাকেন। আরাফায় অবস্থান করা ফরজ। এটা ছাড়া হজ আদায় হবে না। তাই এ ব্যাপারে সচেতন থাকা জরুরি।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস ১৪০৬৩, ১৪০৬৮; মানাসিক ২০৪; গুনইয়াতুন নাসিক পৃ. ১৫৭; আদ্দুররুল মুখতার ২/৫০৬

 

 

 

 

৩০. সূর্যাস্তের আগে আরাফার ময়দান ত্যাগ করা: সূর্যাস্তের আগে আরাফার ময়দান ত্যাগ করা নাজায়েজ। সৌদি সরকারের পক্ষ থেকেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়, যেন বাসগুলো সূর্য ডোবার আগে না ছাড়ে। কিন্তু বহু লোক সূর্য ডোবার অনেক আগেই মুযদালিফার দিকে রওনা হয়ে যায়। এটা মারাত্মক ভুল। মনে রাখতে হবে, সূর্যাস্তের আগে আরাফার ময়দান ত্যাগ করলে দম ওয়াজিব হয়ে যায়। এমনভিাবে সূর্য ডোবার আগেই যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে অনেককে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। অথচ ওই সময় তাসবীহ, দুআ ও মুনাজাতের মূল সময়। আর এ সময়টি অনেকেরই বড় উদাসীনতায় কাটে। যা মোটেও কাম্য নয়।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস ১৫৪১৯; মানাসিক মোল্লা আলী কারী পৃ. ২১০; গুনইয়াতুন নাসিক পৃ. ১৫৯; আদ্দুররুল মুখতার ২/৫০৮আবার কেউ কেউ মুজদালিফা নিশ্চিত না হয়েই নামাজ পড়ে নেন। এটাও ভুল। অথচ একটু সচেতন হলেই মুজদালিফায় অবস্থান করা ও নামাজ পড়া সম্ভব।মুজদালিফায় অবস্থান সংক্রান্ত ভুল-ভ্রান্তি

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

৩১. মাগরিব ও ইশা পড়া নিয়ে ভ্রান্তি: মাগরিব ও ইশা মুজদালিফায় গিয়ে একত্রে পড়া জরুরি। এটা তো ঠিক আছে। কিন্তু কখনো ভিড়ের কারণে গাড়ি ফজরের আগে মুজদালিফায় পৌঁছতে পারে না। তখন অনেকে মুজদালিফায় পড়ার আশায় এ দুই ওয়াক্ত নামাজ কাজা করে ফেলেন। অথচ মাসআলা হলো, ইশার সময়ের মধ্যে মুজদালিফায় পৌঁছার ব্যাপারে আশঙ্কা থাকলে পথেই মাগরিব-ইশা পড়ে নেওয়া জরুরি। অন্যথায় এ দুই ওয়াক্ত কাজা করার গুনাহ হবে।-মানাসিক মোল্লা আলী কারী পৃ. ২১৬; গুনইয়াতুন নাসিক পৃ. ১৬৪; আদ্দুররুল মুখতার ২/৫১০

 

 

 

 

৩২. মুজদালিফার বাইরে অবস্থান: কোনো কোনো হাজি সাহেবকে মুজদালিফার বাইরে অবস্থান করতে দেখা যায়। অথচ মুজদালিফায় রাত্রি যাপন করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা এবং সুবহে সাদিকের পর কিছু সময় ‘উকুফ’ করা ওয়াজিব। তাই মুজদালিফার সীমানা ভালোভাবে দেখে তার ভেতরেই অবস্থান করা জরুরি।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস ১৪০৭১; মানাসিক মোল্লা আলী কারী পৃ. ২২০; গুনইয়াতুন নাসিক পৃ. ১৬৬-১৬৭; আলমুগনী ইবনে কুদামা ৫/২৮২; রদ্দুল মুহতার ২/৫১১

 

 

 

 

৩৩. মুজদালিফায় পাথর সংগ্রহকে জরুরি মনে করা: প্রথম দিনের ৭টি কংকর মুজদালিফা থেকে নেওয়া মুস্তাহাব। কিন্তু অনেক হাজি মুজদালিফা থেকে তিন দিনের সকল পাথর সংগ্রহ করা জরুরি মনে করে থাকে। ফলে মুজদালিফায় পৌঁছতে দেরি হয়ে গেলে সুবহে সাদিকের পরও অনেককে পাথর কুড়াতে দেখা যায়। অথচ সুবহে সাদিকের পর থেকে চারদিক ফর্সা হওয়া পর্যন্ত দুআ-দরূদ ও জিকির-আযকারে মশগুল থাকা সুন্নত। এটিই উকুফে মুযদালিফার প্রধান সময়। আর এ সময় পাথর কুড়াতে ব্যস্ত থাকা অত্যন্ত ভুল কাজ। পাথর নেওয়ার উত্তম সময় হলো মুজদালিফা থেকে মিনায় যাওয়ার পথে কিংবা মুজদালিফায় রাতে পৌঁছে গেলে তখনও কুড়িয়ে নেওয়া যেতে পারে।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৩৬২২, ১৩৬২৪; মানাসিক ২২২; গুনইয়াতুন নাসিক পৃ. ১৬৮; আলমুগনী ইবনে কুদামা ৫/২৮৮; রদ্দুল মুহতার ২/৫১৫

 

 

 

 

 

 

৩৪. রমী সংক্রান্ত- ভুল-ভ্রান্তি: অনেকে সাতের অধিক পাথর মেরে থাকেন। এটি শরিয়ত পরিপন্থী কাজ। এ থেকে বেঁচে থাকা জরুরি।-ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২৭৫; মানাসিক ২৫০; রদ্দুল মুহতার ২/৫১৩

 

 

 

 

৩৫. সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও অন্যকে দিয়ে পাথর মারানো: সামান্য ওজর বিশেষত মহিলাদের পক্ষ থেকে বদলি হিসেবে অন্যকে দিয়ে পাথর মারানো হয়। অথচ দুর্বল ও মহিলারাও রাতের বেলা অনায়াসে পাথর মারতে পারেন। জামরা পর্যন্ত হেঁটে বা গাড়িতে গিয়ে মারার ব্যবস্থা এবং সামর্থ্য থাকলে অন্যকে দিয়ে পাথর মারা জায়েজ নয়। এতে কংকর মারার হক আদায় হবে না। এক্ষেত্রে পুনরায় কংকর মারা ওয়াজিব। না মারলে দম ওয়াজিব হবে।-ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৫৩৯৪; মানাসিক ২৪৭; গুনইয়াতুন নাসিক পৃ. ১৮৭

 

 

 

 

 

৩৬. পাথর ছাড়া অন্য বস্তু নিক্ষেপ করা: অনেকে মনে করেন ওই স্তম্ভগুলোই শয়তান। তাই সেখানে জুতা-স্যাণ্ডেলও মারতে দেখা যায়। এটা মূর্খতা। জুতা স্যান্ডেল মারা জায়েজ নেই। স্তম্ভগুলো তো হলো পাথর নিক্ষেপের জায়গা নির্ধারণের আলামত মাত্র। এখানে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট সংখ্যক পাথরই নিক্ষেপ করা জরুরি। ব্যতিক্রম করার অবকাশ নেই।-মানাসিক মোল্লা আলী কারী পৃ. ২৪৮; গুনইয়াতুন নাসিক পৃ. ১৮৮; আলমুগনী ইবনে কুদামা ৫/২৮৯; আদ্দুররুল মুখতার ২/৫১৪

 

 

 

 

৩৭. মাথা আংশিক হলক করা: কেউ কেউ মাথার অর্ধেক হলক করে বাকি অর্ধেকে চুল রেখে দেন। এমন একজনকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করা হলো, উত্তরে তিনি বললেন, ‘যেহেতু পরে আরেকটি উমরা করব তাই অর্ধেক হলক করেছি। দ্বিতীয় উমরা করে বাকিটা হলক করব।’ এটাও ভুল। হজ্বের সময় তো নয়ই অন্য সময়ও এভাবে অর্ধেক হলক করা নিষেধ। তাই পরবর্তী সময়ে আরো উমরা করলেও প্রথমবারেই পূর্ণ মাথা হলক করে নিবেন। পরে উমরা করলে ওই হলকের উপর খুর বা ব্লেড ঘুরিয়ে নিলেই চলবে। এ ছাড়া মাথার চুল যদি আঙ্গুলের করের চেয়ে বড় থাকে তাহলে প্রথমবার চুল একেবারে ছোট ছোট করে কেটে নিতে পারেন। আর পরবর্তী উমরা করে হলক করে নিবেন।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস ১৩৭৯৯, ১৪৭৮২; মানাসিক মোল্লা আলী কারী পৃ. ২২৯; গুনইয়াতুন নাসিক পৃ. ১৭৪; রদ্দুল মুহতার ২/৫১৬

 

 

 

 

 

৩৮. পারিশ্রমিকের বিনিময়ে উমরা করা বা করানো: অনেকে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে অন্যের জন্য উমরা করে থাকেন। এটা সম্পূর্ণ নাজায়েজ। যে এমন করবেন তার উমরা আদায় হবে না এবং যার পক্ষ থেকে করা হবে সেও কোনো ছওয়াব পাবে না।-আলমুগনী ইবনে কুদামা ৫/২৩; রদ্দুল মুহতার ২/৬০১

 

 

 

 

৩৯. ইহতিয়াতি দম: হাজিদের মধ্যে এর ব্যাপক প্রচলন রয়েছে যে, হয়তো অজান্তেই কত ভুল হয়েছে, যে কারণে দমও ওয়াজিব হয়েছে। তাই সতর্কতামূলক অনেকেই দম দিয়ে থাকেন। এটিও ভুল। শরিয়তে শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে দম দেওয়ার কোনো বিধান নেই। এটি শরিয়তের হুকুমের মধ্যে নিজ থেকে সংযোজনের শামিল। তাই তা অবশ্যই পরিত্যজ্য। ভুল আমলের কোনো শেষ নেই। মাসআলা না জানা বা অসচেতনতার কারণে কত শত ভুলই হয়ে যেতে পারে। তাই শুদ্ধ আমলের জন্য সঠিকভাবে মাসআলা জানা জরুরি। এখানে কেবল ওইসব ভুলই আলোচনা করা হলো, যা ব্যাপকভাবে ঘটে থাকে।আল্লাহ তাআলা সকল হাজি সাহেবকে সঠিকভাবে হজ আদায়ের তাওফীক দিন। আমীন।