প্রথমবার্তা,প্রতিবেদকঃ   প্রখ্যাত মুহাদ্দিস আহমাদ বিন মুহাম্মাদ বিন হাম্বল (রহ.)। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ’র কাছে তিনি সম্মানিত চার ইমামের চতুর্থজন। ফিকহে ইসলামীতে হাম্বলি মাযহাব তাকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে। তিনি ইলমের সমৃদ্ধি, অনন্য স্মৃতিশক্তি ও উত্তম চরিত্রের কারণে প্রশিদ্ধ ছিলেন।

 

 

 

 

 

প্রসিদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য হাদিসগ্রন্থ মুসনাদে আহমাদ তাঁরই সংকলিত। ইনশাআল্লাহ, এ নিবন্ধে আমরা ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রহ.) ও এক রুটি বিক্রেতার প্রসিদ্ধ গল্পটি শুনব। সঙ্গে আরও জানব তাঁর বেড়ে ওঠা, তাঁর স্ত্রী ও সন্তানদের কথাও।

 

 

 

 

এক সফরকালে ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রহ.) একটি মসজিদে রাত্রিযাপনের ইচ্ছা করেন। কিন্তু, মসজিদের খাদেম তাকে এ থেকে বারণ করে বেরিয়ে যেতে বললেন। তিনি খাদেমকে সবিনয় বলেন, আমি শুধু আমার পায়ের জায়গাটুকুতেই ঘুমাব- আর কার্যত তিনি তাই করলেন। তবু খাদেম জোর গলায় তাকে মসজিদ থেকে বের হয়ে যেতে বললেন। তিনি ছিলেন অতিবৃদ্ধ। বার্ধক্যের চিহ্ন তাঁর চেহারা ও অবয়বে স্পষ্টভাবেই ফুটে উঠেছিল। একজন রুটি বিক্রেতা তাঁর এ দৃশ্য দেখে মর্মাহত হলেন এবং তাঁকে নিজের কাছে রাত্রিযাপনের অনুরোধ করলেন।

 

 

 

 

 

 

 

রুটি বিক্রেতা ইবনে হাম্বলকে সম্মানের সঙ্গে তার দোকানে নিয়ে গেলেন। তাঁর শোয়ার বন্দোবস্ত করে পুনরায় সে রুটি তৈরির কাজে লেগে গেলেন। তিনি যখন খামিরা বানাতে বানাতে অবিরত ইস্তেগফার পাঠ করছিলেন। এভাবে দীর্ঘ সময় কেটে গেল। আহমাদ বিন হাম্বল (রহ.) তার এ অবস্থায় আশ্চর্যান্বিত হলেন এবং রাতেই তাকে তার ইস্তেগফার পাঠ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। রুটি বিক্রেতা জবাব দিলেন, দীর্ঘকাল থেকে এভাবেই তিনি সর্বক্ষণ ইস্তেগফার পাঠ করছেন। এরপর ইবনে হাম্বল জানতে চাইলেন- আপনি কি এর কোন ফলাফল পেয়েছেন? তিনি এ প্রশ্ন করলেন যদিও তিনি জানেন ইস্তেগফারের ফযিলত ও ফলাফল।

 

 

 

 

রুটি বিক্রেতা জবাব দিলেন, হ্যাঁ। আল্লাহর কসম আমি যে দু’আই করেছি, আল্লাহ কবুল করেছেন। তবে একটি দু’আ ব্যতীত। ইবনে হাম্বল বললেন- কি ছিল সেই দু’আ? রুটি বিক্রেতা বললেন- আমি ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বলকে দেখতে চেয়েছিলাম। ইবনে হাম্বল তাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, আমিই ইবনে হাম্বল! আল্লাহর শপথ! তিনি আমাকে আপনার কাছে জোর করেই নিয়ে এসেছেন।ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রহ.)- এর বেড়ে ওঠা:

 

 

 

 

আহমাদ বিন হাম্বল (রহ.) শিশুকালেই তাঁর বাবাকে হারান। জানা যায় তাঁর বাবা মাত্র ৩০ বছর বয়সের যুবক থাকতেই মারা যান। তাঁর মা তাঁকে লালন-পালন করেন। বাগদাদে তাঁর পিতা তাদের বসবাসের জন্য কিছু স্থাবর সম্পত্তি রেখে যান। তিনি বাগদাদেই প্রতিপালিত হন। তখন এ শহর ছিল লোকে-লোকারণ্য। যাদের একেক রকম জীবনাচার ও পানাহারের অভ্যাস ছিল। শহরটি বিভিন্ন রকম জ্ঞান-বিজ্ঞানের শাস্ত্রীয় চর্চায় পরিপূর্ণ ছিল। অনেক কারী, সুফি সাধক, মুহাদ্দিস ছিলেন। আরও ছিলেন বহু ভাষাবিদ, পণ্ডিত ও ফালসাফাবিদেরা। তাদের দরস, পঠন-পাঠন, চর্চা ও পদচারণায় ভরপুর মুখরিত ছিল এ শহর।

 

 

 

 

 

আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.)- এর মা তাঁর শিক্ষা-দীক্ষার ব্যাপারে খুবই গুরুত্ব দিতেন। তিনি শিশুকালেই পবিত্র কুরআন হিফয সম্পন্ন করেন। বিশ্বস্ততা ও খোদাভীতির সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মাঝে তীক্ষ্ণ মেধার বিভিন্ন আলামত প্রকাশ পেতে থাকে। এরপর তিনি লেখালেখি ও আনুসাঙ্গিক জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে আদালতমুখী হন। ইবনে হাম্বল ছোটবেলা থেকেই মানুষের বিশ্বস্ততা অর্জন করেন। তিনি তাঁর উত্তম চরিত্র ও দৃঢ় মনোভাবের জন্য আত্মীয়, প্রতিবেশী ও পরিচিত মহলে প্রসিদ্ধ ছিলেন।

 

 

 

 

আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.)- এর স্ত্রী ও সন্তানরা: ইবনে হাম্বল (রহ.) ৪০ বছর বয়সে পৌঁছে বিয়ে করেন। এটা ছিল ইলমের প্রতি তাঁর অত্যধিক ব্যস্ততার কারণে এবং এজন্যেও যে তাঁর সম্মানিতা মাই সর্বদা তাঁর পাশে থাকতেন ও তাঁর সবকিছুর দেখভাল করতেন। এমনকি বিভিন্ন সফরেও তাঁর মা সঙ্গে থাকতেন। তিনি উত্তম নারীদের সঙ্গেই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। প্রথমজন ছিলেন বাগদাদ উপকণ্ঠের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে আব্বাসাহ বিনতে ফজল।

 

 

 

 

 

তার সঙ্গে তিনি প্রায় ৩০ বছর সংসার জীবন-যাপন করেন। এই স্ত্রী থেকেই তাঁর ছেলে সন্তান সালেহ জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মারা গেলে বিয়ে করেন ‘রায়হানা’ নামক এক নেককার নারীকে। তার থেকে আব্দুল্লাহ নামে এক ছেলে সন্তান জন্মলাভ করেন। এরপর এই স্ত্রীও যখন মারা যান, তিনি ‘হুসন’ নামে একজন বান্দী ক্রয় করেন। তার থেকে হাসান ও হুসাইন নামে দু’জন সন্তান জন্মলাভ করে এবং মারা যায়। এরপর আরও দুই সন্তান হাসান ও মুহাম্মাদ জন্মলাভ করে, এরপর আরও এক সন্তান সাঈদ জন্মলাভ করে।