প্রথমবার্তা,প্রতিবেদকঃ   ইসলামী শরীয়াহ আল্লাহপ্রদত্ত এক পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা, যা তার অনুসারির জীবনের সমস্ত অধ্যায়ের মাঝে শিষ্টাচার ও চারিত্রিক পরিশুদ্ধতাকে বিশেষভাবে গুরুত্ত্ব দিয়েছে। তাইতো রাসুল (সা.) বিশ্বাসী বান্দার ঈমানের পরিপূর্ণতার স্তরকে আপেক্ষিকভাবে চরিত্রে অধিক উত্তমতার সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন। তিনি ইরশাদ করেন-‘মুমিনদের মধ্যে ঈমানে অধিক পরিপূর্ণ সে, যে তাদের মধ্যে চরিত্রে সর্বোত্তম।’ (আহমাদ, আবু দাউদ, তিরমিযি)

 

 

 

 

সুতরাং উত্তম চরিত্র হচ্ছে, পরিপূর্ণ ঈমানের প্রকাশ। চরিত্রের সৌন্দর্য ব্যতীত ঈমানের পরিপূর্ণতা প্রতিফলিত হয় না। বরং নবী কারীম (সা.) তো বলেছেন যে, তাঁকে প্রেরণের অন্যতম মহান উদ্দেশ্য হচ্ছে উত্তম চরিত্র ও উন্নত শিষ্টাচারের পরিপূর্ণতা দান করা।তিনি ইরশাদ করেন, ‘আমি উন্নত চরিত্র ও শিষ্টাচারকে পরিপূর্ণ করে দিতে প্রেরিত হয়েছি।’ (বুখারি, মুসনাদে আহমাদ)

 

 

 

 

সর্বোন্নত ও সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)। আল্লাহ তা’আলা এ স্বীকৃতি জানিয়ে পবিত্র কুরআনে তাঁর প্রশংসায় বলেছেন- وَإِنَّكَ لَعَلى خُلُقٍ عَظِيمٍ ‘নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রে অধিষ্ঠিত।’ (সুরা কলাম-৪)কিন্তু আফসোস যে বস্তুবাদী সমাজ-সভ্যতায় আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে মুসলমানদের মাঝেও আজ চরিত্রের দিকটি উপেক্ষিত।

 

 

 

 

 

একজন মুসলমানের আচার-আচরণে আল্লাহর সাথে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে, অন্য মানুষের সাথে, এমনকি নিজের সাথে কেমন হওয়া উচিত ইসলাম তার এক অভিনব চকমপ্রদ চিত্র এঁকে দিয়েছে। যখনই একজন মুসলমান বাস্তবে ও তার লেনদেনে ইসলামী চরিত্রের অনুসরণ করে তখনই সে অভিষ্ট পরিপূর্ণতার অতি নিকটে পৌঁছে যায়, যা তাকে আরও বেশি আল্লাহর নৈকট্য লাভ ও উচ্চ মর্যাদার সোপানে উন্নীত হতে সহযোগিতা করে। পক্ষান্তরে, যখনই একজন মুসলমান ইসলামের চরিত্র ও শিষ্টাচার হতে দূরে সরে যায় সে বাস্তবে ইসলামের প্রকৃত প্রাণ চাঞ্চল্য, নিয়ম-নীতির ভিত্তি হতে দূরে সরে যায়। সে যান্ত্রিক মানুষের মত হয়ে যায়, যার কোনো অনুভূতি এবং আত্মা নেই।

 

 

 

 

আল্লাহ ইসলামের ইবাদতগুলোকেও চরিত্রের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে দিয়েছেন। যার ঈমান ও ইবাদত তার চরিত্রে উন্নতির প্রকাশ ঘটায় না তা আসলে মর্মহীন প্রথাপালন মাত্র। ইসলামের ভিত্তি যে পাঁচ জিনিসের উপর, প্রথমটি তার ঈমান। কেউ ঈমান এনে ইসলাম গ্রহণের পর তার আত্মা ও চরিত্রশুদ্ধির প্রথম ধাপে যাবতীয় অন্যায় অশ্লীলতা অনাচার পাপাচার হারাম হয়ে যায়।দ্বিতীয় স্তম্ভ নামায। আত্মশুদ্ধি ও আত্মার উন্নতি ঘটবে- এমন প্রভাব আল্লাহ এর মাঝে রেখে দিয়েছেন।আল্লাহ তা’আলা বলেন, إِنَّ الصَّلَاةَ تَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ‘নিশ্চয়ই নামায অশ্লীল, অপছন্দনীয় কাজ হতে নিষেধ করে।’ (সুরা আনকাবুত-৪৫ )

 

 

 

 

 

 

নামাযের মধ্যে আল্লাহ তা’আলা এই বৈশিষ্ট্য ও প্রভাব রেখে দিয়েছেন যে, নামাযি ব্যক্তিকে নামায যাবতীয় পাপাচার ও মন্দ কাজ হতে বাধা প্রদান করবে। যেমনটা হযরত শুয়াইব আলাইহিস সালামের জাতি বুঝেছিল- যখন তারা দেখল, তাদের মধ্য থেকে কেবল শুয়াইব-ই মূর্তি পূজা করে না, মাপে কম দেয় না এবং অন্যান্য সমস্ত মন্দ থেকে বেঁচে থাকে আর তাদেরও মন্দ থেকে বাঁচার কথা বলে, মূর্তি পূজা পরিত্যাগ করতে বলে।

 

 

 

 

 

 

তারা লক্ষ্য করলো তাদের মাঝে আর শুয়াইবের মাঝে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে, তা হলো শুয়াইব নামায আদায় করে। আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআনে বলেন, ‘তখন তারা শুয়াইব (আ.)- কে জিজ্ঞেস করল, হে শুয়াইব, আপনার নামাযই কি আপনাকে এই আদেশ দেয় যে, আমরা ওইসব উপাস্যদের পরিত্যাগ করব যাদের উপাসনা আমাদের পিতৃ-পুরুষেরা করত? অথবা আমাদের ধন-সম্পদে ইচ্ছামত যা কিছু করে থাকি, তা ছেড়ে দেব?’ (সুরা হুদ-৮৭)

 

 

 

 

তবে আবশ্যক যে, ব্যক্তি নামায আদায়ে ইখলাস ও একনিষ্ঠতার সাথে নিয়মিত হতে হবে এবং নামায আদায় করতে হবে সে সকল শর্ত ও আদবের সাথে যা- নামায আল্লাহর কাছে কবুল হওয়ার জন্য আবশ্যক। যেমন: হাদিস শরিফে এসেছে, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)- এর খিদমতে এসে বলল, অমুক ব্যক্তি রাতে নামায আদায় করে আর ভোরে উঠে চুরি করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, শীঘ্রই তার নামায তাকে ওই বড় কাজ হতে ফিরাবে যার কথা তুমি বলেছ। (মুসনাদে আহমদ)তৃতীয় স্তম্ভ রোযা মুমিনকে তাকওয়া অর্জনের দিকে ধাবিত করে। আর তাকওয়া হচ্ছে মহান চরিত্রের অন্যতম।

 

 

 

 

 

 

আল্লাহ তা’আলা বলেন-يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোযা ফরয করা হয়েছে যেমনি ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর যাতে তোমরা তাকওয়া লাভ করতে পার।’ (সুরা বাকারাহ-১৮৩)এমনিভাবে রোযা শিষ্টাচার, ধীরস্থিরতা, প্রশান্তি, ক্ষমা, জাহেলদের থেকে বিমুখতা ইত্যাদির প্রতিফলন ঘটায়। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, ‘তোমাদের কারও রোযার দিন যদি হয়, তাহলে সে যেন অশ্লীল কথাবার্তা না বলে, হৈ চৈ না করে অস্থিরতা না দেখায়। যদি কেউ তাকে গালি দেয় অথবা তার সাথে লড়াই করে সে যেন বলে দেয় আমি রোযাদার।’ (বুখারী ও মুসলিম)

 

 

 

 

চতুর্থ স্তম্ভ যাকাত অন্তরকে পবিত্র করে, আত্মাকে পরিমার্জিত করে এবং তাকে কৃপণতা, লোভ ও অহংকারের ব্যধি হতে মুক্ত করে। আল্লাহ তা’আলা বলেন- خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِمْ بِهَا ‘তাদের সম্পদ হতে আপনি সাদকাহ গ্রহণ করুন যার মাধ্যমে আপনি তাদের পবিত্র ও পরিমার্জিত করবেন।’ (সুরা তাওবাহ ১০৩ আয়াত)পঞ্চম স্তম্ভ হজ: আর হজ হচ্ছে আত্মশুদ্ধি, হিংসা-বিদ্ধেষ ও পঙ্কিলতা থেকে আত্মাকে পরিশুদ্ধকরণ ও পরিমার্জনের জন্য একটি প্রায়োগিক প্রশিক্ষণশালা।আল্লাহ তা’আলা বলেন- فَمَنْ فَرَضَ فِيهِنَّ الْحَجَّ فَلَا رَفَثَ وَلَا فُسُوقَ وَلَا جِدَالَ فِي الْحَجِّ‘যে এ মাসগুলোতে নিজের উপর হজ ফরয করে নিল সে যেন হজের মধ্যে অশ্লীলতা, পাপাচার ও ঝগড়া বিবাদ না করে।’ (সুরা বাকারাহ : ১৯৭)

 

 

 

 

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন-‘যে ব্যক্তি অশ্লীল কথা-বার্তা ও পাপ কর্ম না করে হজ পালন করল, সে তার পাপ রাশি হতে সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুর মত নিষ্পাপ হয়ে ফিরে এল।’ বুখারী ও মুসলিমআমরা যেন দ্বীনের মর্ম উপলব্ধি করে সমস্ত মৌলিক ও শাখাগত ইবাদতগুলো করি, পাশাপাশি উত্তম চরিত্র ও উন্নত শিষ্টাচারের মাধ্যমে জীবনে ঈমান ও ইসলামের পরিপূর্ণতার সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলতে পারি- রাব্বুল আলামিন সেই তাওফিক দান করুন। আমিন।