সাফাত বিন ছানাউল্লাহ্:   ” ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে ”  ” আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ ” এই সব মর্মবাণী বিখ্যাতরা বলে গেছেন আর এখনো সমাজ রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে কোন প্রয়োজনবোধে আমরা প্রতিনিয়ত বলে যাচ্ছি। বক্তৃতায়, টকশোতে, আলোচনায় অনেকে আমার বিষয়গুলো নিয়ে চর্বিতচর্বণ করেন। কিন্ত, দেশের মহামূল্যবান সম্পদ শিশুরা যে অনেকখানি পিছিয়ে যাচ্ছে বা বৈষম্যের শিকার হচ্ছে এসব নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করেন কয়জন? আজও আমাদের দেশের শিশুরা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। শিক্ষার আলো তাদের হৃদয় ঘরে জলছে না। দেশটা যখন স্বাধীন হয়েছিল অনেক শিশুরা পর্যন্ত ভূমিকা রেখেছিলেন দেশকে শত্রুমুক্ত করতে সেই খবরই বা রাখেন কয়জন?

 

 

 

 

বাংলাদেশটা যদি একবার ঘুরে দেখা যেত তবেই বুঝতে পারতাম শিশুরা কত অসহায়। যে বয়সে তাদের বই, খাতা, পেন্সিল নিয়ে স্কুলে যাওয়ার কোমল সেই বয়সে কঠিন কাজ তাদের দিয়ে করানো হচ্ছে অত্যন্ত নির্দয়ের সঙ্গে। আমি একজন বাংলাদেশ নামক দেশটির সামান্য একজন নাগরিক হয়ে যদি চোখে দেখতে হয় একজন ছোট বাচ্চা যার বয়স কিনা ১০-১২ বছর ভারী বোঝা কাঁধে নিয়ে পথের পর পথ অতিক্রম করছে বড় কষ্ট আর অনুশোচনা হয় স্বাধীন দেশটার জন্য।এসবের জন্য তো আমরা মুক্তিযুদ্ধ করিনি! মাত্র নয় মাসে ছিনিয়ে আনিনি বিজয় পতাকা!

 

 

 

 

 

 

আমাদের এই রাষ্ট্রটির যিনি প্রতিষ্ঠাতা জাতীর পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শিশুদের ভালবাসতেন। আদর করতেন আপনজনের মত। তাইতো প্রতিবছর বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন কে জাতীয় শিশু দিবস ঘোষণা করেছে সরকার। ঐ দিনে আমাদের দেখা যায় ওদের প্রতি কত দরদ, দেখানো ভালবাসা আর স্নেহ, মমতা। বিশেষ দিনটি চলে গেলে কার খবর কে নেয়। শুধুমাত্র এসব করেই কী আমাদের দায়িত্ব শেষ?আমি ইদানিং টেলিভিশন খুব একটা দেখিনা। মিথ্যার ফুলঝুরি আর গালগল্প দেখতে শুনতে অনেক সময় পেড়িয়ে গেছে, জীবনের বাকি দামি সময়গুলো এখন কাজে লাগাতে চাই। রিমোর্টের বোতাম টিপলে একের পর এক বচন আর বাণীতে চ্যানেলগুলো সয়লাব। টকশোতে বসলেই বুদ্ধিজীবীর যেন নতুন প্রাণ পান। এটা করতে হবে, ওটা করতে হবে, এটা চাইনা, ওটা চাইনা এসব বলতে বলতে এক সময় ঝগড়া এমনকি হাতা হাতি ও দেখেছি। এসব আবার চারকোণা বিশিষ্ট বক্সের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।

 

 

 

 

 

ঢাকা থেকে ট্রেনে চট্টগ্রাম ফিরছিলাম। একটা ছেলে ওটল কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে। ওর সাথে আমার দেখা এবং কথা হয় কুমিল্লা গিয়ে। বয়স মাত্র ১২-১৩ বছর। সেও যাবে চট্টগ্রাম মায়ের সাথে দেখা করতে ।নাম রাজু, বাড়ী কিশোরগঞ্জ। আমার একটা বদঅভ্যাস কোন ছোট বাচ্চা, বয়স্ক বা বন্ধু বয়সী নতুন কাউকে দেখলে কুশল বিনিময় করি, পরিচিত হওয়ার চেষ্টা করি। রাজু নামের ছেলেটি ঢাকায় কাজ করে সিমেন্টের দোকানে। বাবা হটাৎ মারা যাওয়ায় একপ্রকার বাধ্য হয়েই তার মা চট্টগ্রামে এসে গার্মেন্টস এ চাকরি করে। তাঁর একটা ছোট বোন ও আছে দুই বছরের। আলাপনীতে এসব বলছিল রাজু। জিগ্যেস করলাম – তুমি তো অনেক ছোট, কাজ কেন কর? পরতে ইচ্ছে করেনা?

 

 

 

 

 

চোখ মুছে যে বলল, বাবা নেই কাজ করতে হবে। আমি চট্টগ্রাম আসা পর্যন্ত বড়ভাইয়ের মত অনেক বোঝালাম যে, তোমার মা কাজ করে অবশ্যই তুমি আর বোনটিকে দেখবে। কোন কাজ করার প্রয়োজন নাই। তুমি নতুন করে পড়ালেখা শুরু কর।আজকাল গরীব আর অসহায়দের জন্য অনেক সুযোগসুবিধা আছে। সে বলে – ৩য় শ্রেণী পর্যন্ত পরেছে সে। বাবা মারা যাওয়ার কিছুদিন পর বাড়ী থেকে পালিয়ে গিয়ে ৬ মাস নিখোঁজও ছিল সে। তারপর দোকানে চাকরি নিয়ে ঢাকায় থাকতে শুরু করে। একা  ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম আসতে কোন সমস্যা হবে না জিগ্যেস করতেই সোজা উত্তর- না।

 

 

 

 

 

 

আমার সাহস আছে। একবার মায়ের সাথে এসেছিলাম সেই থেকে আমি চিনি। রাজু তাঁর বেগে ছোট বোনটার জন্য লিচির প্যাকেট, চকলেট আরো কত কিছু নিয়েছে অনেকদিন পর দেখা হবে বলে। রাজু আনন্দের সাথে বললো ভাইয়া – আমাকে দেখে মা আর বোন অনেক খুশি হবে। সিটে বলে গল্প শুনছিলাম আর মনে মনে আবেগাপ্লুত হয়ে চিন্তা করছিলাম – কত ভালবাসা আর সুন্দর একটি মন থাকে এসব সম্ভব!রাত ১০ টায় ট্রেন থেকে নেমে রাজুর দেয়া নাম্বারে মাকে ফোন করলে কিছুক্ষণ পর মা এসে অনেকক্ষণ জড়িয়ে ধরে উৎফুল্ল হয়ে সন্তানকে আগলে রাখলেন।

 

 

 

 

 

 

আমিও রাজুর মাকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম – আপনার ছেলে অনেক ভাল। সে গভীরভাবে চিন্তা করে তাঁর যে একটা ছোটবোন আছে ওর জন্য কিছু নিয়ে যেতে হবে। রাজুকে আবার স্কুলে ভর্তি করে দিন। আপনি সামাজিক ও রাষ্ট্রের অনেক সুযোগসুবিধা পাবেন। কেঁদে কেঁদে মা বলল কী করব। বাবা নেই, সংসার চালাতে হবে তো। তাকে বললাম – বাবা সারাজীবন কারো থাকেনা। আমার ও বাবা নেই! আমার মায়ের ও স্বামী নেই! তাই বলে রাজুর সুন্দর ভবিষ্যৎ আপনি নষ্ট করবেন না। আমার কথায় যদি রাজুর মায়ের একটু হলেও বোধগম্য হয় তাহলেই আমার মত একজনের প্রশান্তি এই ভেবে যে, কিছু কথার কার্যকারিতা হবে, একজন সম্ভাবনাময় সোনালী ভবিষ্যৎ ফিরে পাবে।

 

 

 

 

 

 

 

 

শুধু কিশোরগঞ্জের অজপাড়ার রাজু নয় সারা দেশের আজ লক্ষ রাজুর জীবন বড়ই দুর্বিষহ। সুন্দর পৃথিবীতে জন্মানোর পরও অন্ধকার জীবন পায় ওরা নিয়তির ভাগ্যদোষে। শিশুশ্রম বন্ধে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে সরকার সহ বেসরকারি, সামাজিক সংগঠন গুলো থেকে। জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে পাশ করতে হবে “শিশুশ্রম বন্ধে নতুন আইন”। আবার দেখা যায়, অহরহ আইন পাশ হচ্ছে, সঠিক প্রয়োগ যথাযথ কার্যকরের বেলায় শুভঙ্করের ফাঁকি। যদি এ ব্যাপারে জনসচেতনতা বাড়ানো যায় তবেই কোমলমতি শিশুদের দিয়ে কাজ করানো বন্ধ হবে। শিক্ষা, সমাজ,রাষ্ট্র সচেতনরা এগিয়ে এলেই আমাদের দেশটা ১০০ বছর এগিয়ে যায় ।