ফাহমিদা খানম:   ছোটবেলায় শেখা — যারা আমাদের শিক্ষা দিবেন, মা-বাবার পরেই তাদের অবস্থান তাই তাদেরকে সেই চোখেই আজীবন সম্মান করে এসেছি। এখনো রাস্তা-ঘাটে শিক্ষকদের দেখলে পা ছুঁয়ে সালাম করি, বাচ্চারা আমাকে নিয়ে হাসে – তাদের মা নাকি আপডেট হতে পারেনি, সত্যিই পারিনি! আমার সন্তানদের এই কথা বললে তারা বলে মা যুগ বদলে গেছে – এখনকার শিক্ষকদের সম্মান করতে ইচ্ছে করেনা তাদের স্বভাবের কারণেই, কি ভয়ংকর কথা! শিক্ষিকতা শব্দটার মানে না বুঝেই আজকাল যারা শিক্ষক হচ্ছেন –তারা কি বুঝেন এই শব্দটার আসল মানে কি?

 

 

 

 

 

আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন এস এস সি আর এইচ এস সি তে যারা স্ট্যান্ড করতো টিভিতে তাদের স্বাক্ষাৎকার দেখাতো, হ্যাঁ করে আমরা শুনতাম –কতোজন যে বলতো তারা পড়ালিখা শেষ করে শিক্ষকতা পেশায় যাবে, দেশকে নিরক্ষরমুক্ত করে আলো ছড়িয়ে দিবে সারাদেশে, আজকাল সেসব আর কেউই বলেনা। অন্য পেশার কথা বললেও এটা বলতে শুনিনা। শিক্ষক শব্দের গুরুত্ব, অর্থ না বুঝেই এই পেশায় আসা কতোটা যুক্তিগত? মহান এই পেশাটাকে কলংক করে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাকে কলুষিত কি করছেন না? মানুষ গড়ার কারিগরদের ভেতরেই এতো লোভ ,লালসা ,কামনা দিয়ে ভর্তি থাকলে সে কিভাবে শিক্ষা দিবে? আমাদের যুগের শিক্ষিকদের কেনো সম্মান করতাম? কারণ তারাও আমাদের সন্তানই ভাবতেন ,আজকাল সবাই আর পড়াতে আসেনা ,ব্যবসা করতে আসে শিক্ষকতায়।

 

 

 

 

 

আমাদের ইংরেজী স্যার ছিলেন অসম্ভব কড়া ,উনাকে সবাই ভয় পেতো। আমরা দল বেঁধে স্কুলে আসার সময় কিছু বখাটে শিষ বাজাতো, বাজে কথা বলতো, স্যার শুনে মেয়েদের দলের পিছনে আসতেন, ভয়েই কাউকে দেখতাম না ,এটা স্যারের দায়িত্বের মাঝে না পড়লেও উনি করতেন , অংক স্যার ছিলেন রামবাবু স্যার – অংক না বুঝলেও স্কুল ছুটির পর বুঝাতেই থাকতেন –সময়ের দিকে তাকাতেন না । আমি বাচ্চাকে স্কুলে দেবার পর ক্লাস ওয়ানেই এক টিচার পিটিতে সামান্য কথা বলার জন্যে স্কেল দিয়ে ছেলের পিঠে দাগ করে সুখ নিয়েছিল , নির্মম চিহ্ন দেখে আমি সাথে, সাথেই প্রিন্সিপ্যালের বাসায় নিয়ে দেখালাম , উনি উত্তর দিলেন দুস্টুমি করলে এমন শাস্তি পেতেই হবে , আপত্তি থাকলে আমি যেনো বাচ্চা স্কুল থেকে নিয়ে যাই ,উনাদের স্কুলে ভর্তি হবার জন্যে এখনো অনেক বাচ্চাই অপেক্ষামান! জেলা শহরের নামকরা স্কুল তার, একটা স্টুডেন্ট চলে গেলে কিছুই যায় আসেনা ! আমি অনড় ছিলাম বাচ্চা নিবোনা কিন্তু এই কাজের জন্যে সরি বলতেই হবে , বাচ্চা দুস্টামি করবে নাতো কি আমি করবো ? স্কুলে পড়তে পাঠিয়েছি – শিক্ষকদের এটুকু ধৈর্য না থাকলে শিক্ষকতা করতে আসে কেনো? প্রাথমিক শিক্ষা শেষে সরকারী স্কুলে ক্লাশ সিক্সে ভর্তি করার পরে প্রথম দিন জিজ্ঞেস করলাম আজ কি শিখেছ — ছেলে উত্তর দিলো কুত্তার বাচ্চা, এই শব্দ সে বাসায় বা আশপাশ থেকে শিখেনি – স্কুল থেকেই শিখে এসেছে।

 

 

 

 

 

 

প্রথম ক্লাসে বাচ্চাদের অধিক চাপে বিরক্ত হয়ে এই গালি দিয়েছেন তাদের শিক্ষাগুরু , এক সপ্তাহ ছেলেকে আর স্কুলেই পাঠাতে পারিনি ,এক সপ্তাহ পরে যাও গেলো সেদিন ফিরে আরেকটি গালিই সে শুনালো – এটা লিখার উপযুক্ত নাহ। আমি বাচ্চাদের যেভাবে বড়ো করেছি তার বিপরীতে এসব শুনে স্কুলের প্রতিই ছেলের অভক্তি চলে এলো –আমি আর পারিনি দূর করতে! অন্য বাচ্চাদের কিন্তু সমস্যা হয়নি –কারণ তাদের অনেকেই এসবে অভ্যস্ত ছিলো। কলেজে ম্যাথ স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়েনি বলে প্র্যাকটিক্যালে সেই শোধ তুলেছিলেন নাম্বার কম দিয়ে , সব বিষয়ে ভালো করলেও ম্যাথেই ধরা খেলো অথচ সে অংকে অসাধারণ ভালো ছিলো, স্কুল থেকে মেডেল পেয়েছিল শতভাগ নাম্বার সবসময় পেতো বলে। এক শিক্ষকের জন্যে ছেলেটা বুয়েটে ভর্তি পরীক্ষাই দিতে পারেনি, দোষ কার? আমার না সম্মানিত শিক্ষকদের?

 

 

 

 

 

মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করিয়েও ভুগেছি— কিছুতেই ক্লাসে বসে না ,প্রিন্সিপ্যালের অনুমতি নিয়ে আমি মেয়ের জন্যে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতাম , কিছু শিক্ষককে আমি বলতে শুনেছি – শাসন করিনা বলে নাকি বাচ্চা এমন হইছে , মাইর দিলে ঠিক হয়ে যেতো! আশ্চর্য কথা সব বাচ্চা কি একইরকম হবে নাকি ? এক বাচ্চা একই কাজ করতো বলে ক্লাসে বাচ্চাকে এমন শাস্তি দিয়েছিলো যে, সে বাচ্চা অসুস্থ্য হয়ে যেতো স্কুলের কথা শুনলেই ,বাধ্য হয়ে স্কুল বদলেছিল তার মা । ভরষার জায়গাগুলো এতো ভয়ানক কেনো হবে? প্রতিটি বাচ্চা একই হবে না – এই সত্য না নিতে পারলে এই পেশায় কেনো আসেন? বুঝেন আপনারা একটা বাচ্চার শৈশবে কি ভয় ঢুকিয়ে দেন ? আরেকবার ক্লাসের এক বাচ্চাকে শিক্ষিকা ভয়ংকর গালি দিলেন — মেয়ে শব্দটার সাথে পরিচিত নয় বলে জিজ্ঞাসা করলো আমাকে, স্তব্ধ হয়ে গেলাম, পরদিন সেই বাচ্চার মাকে জিজ্ঞেস করে শুনলাম বাচ্চাও মাকে বলেছে –আমি সেই মাকে নিয়ে প্রিন্সিপ্যালের রুমে যেতে চাইলাম উনি বললেন টিচার বাচ্চাকে মারতে পারে তাই উনি যাবেন না, কি আর করা আমিই গেলাম কারণ আমি পড়তে পাঠিয়েছি –গালি শেখাতে নাহ ,পুরো বছর সেই শিক্ষিকা আমার মেয়ের হোম ওয়ার্ক আর দেখেনি , ক্লাস ওয়ার্ক করে নিলে খাতা ছুঁড়ে ফেলে দিতো, আর মেয়েকে বলতো তোর মারে গিয়ে খাতা দেখাইস! চিন্তা করা যায় ? ছোটো বাচ্চা ভয়ে মাকে কিছু বলতে চাইতো না, এই যে লুকিয়ে রাখা –এটা আপনারা আমার বাচ্চার ভেতরেই ঢুকিয়েছেন! অন্যায়ের প্রতিবাদ করাতে তার চক্ষুশূল হয়েছিল আমার বাচ্চা মেয়ে! এটাই এখন স্বাভাবিকতা সব শিক্ষালয়ে তাই বাচ্চারা ভক্তি কেনো করবে ? শ্রদ্ধা জোর করে অর্জন করা যায় না, সেটার যোগ্য করতে হয় নিজেকেই! একেকজন শিক্ষকের ভাব দেখলে মনে হয় শিক্ষা না , ভাব শিখাতে ,দেখাতে এই পেশায় এসেছেন!

 

 

 

 

 

আমাদের অজান্তে অনেক অন্যায় হয় ,হচ্ছে – আমরা মুখ বুঝে থাকি বলেই এরা মাথায় উঠেছে ,মানুষ গড়ার কারিগররা যদি অমানুষ হয় তাহলে সম্মান কেনো করবে এই জেনারেশন ? বোধ ,বিবেকহীন এসব মানুষের পরিবার আছে ,তারা কারো স্বামী কিংবা বাবা ভাবতেও গা শিউরে উঠে! আমার চেনা জগতে অন্য কোনো প্রাণী খুঁজে পেলাম না এদের সঙ্গে তুলনা করার ! আগে তুই রাজাকার বলে ক্ষোভ প্রকাশ করতো সবাই — কয়েকদিন পর শিক্ষকরাই এই গালির সাথে উচ্চারিত হবেন ! আবার অন্যায় করলে অশুভ শক্তিও তাদের পাশে থাকে তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিরাপদ জায়গা –এটাও আর বলা যাচ্ছেনা । স্কুল বলেন ,মাদ্রাসা বলেন —কোথাও বাচ্চারা নিরাপদ না ,পুঁথিগত বিদ্যা মুখস্ত করে সেটা যদি নিজেরাই মনেপ্রাণে ধারণ করতে না পারেন তাহলে বাচ্চাদেরকে কি শিক্ষা দিবেন আপনারা ? শুনেছি পৃথিবীর অনেক দেশেই নাকি শিক্ষকের সম্মান সবার উপরে – যেহেতু তারাই বাচ্চাদের প্রস্তুত করেন ভবিষৎ এর জন্যে বিপরীতে আমাদের দেশের চিত্র কি ? পরিমল স্যার ধর্ষন করেন , হুজুর বাচ্চা ছেলেদের বলাৎকার করেন , প্রধান শিক্ষকের লালসার শিকার হয়ে ক্লাস ফাইভে পড়া বাচ্চা মেয়ের পেটে সন্তান আসে ,  প্রত্যাখিত হয়ে আগুনে পুড়ে মরে ! নিজেদের বোধ ,বিবেক ,সব ধুলোয় মিশিয়ে এসছেন –মানুষ গড়ার কারিগর হতে ? ওয়াক থুঃ – আগে মনেপ্রাণে মানুষ হইতে শিখ তারপর আসিস শিক্ষক হইতে ! এসব নির্লজ্জ ,বেহায়া ,আত্মসম্মানহীন মানুষদের জন্যে পুরো শিক্ষার পরিবেশটাই নস্ট হচ্ছে । শিক্ষকরাই যদি নোরাংমি করেন – সেই জাতির ভালো হয় কিভাবে ? আমাদের বাচ্চারা শিক্ষকদের নোংরামির বলির পাঁঠা হচ্ছে , মারা যাচ্ছে ,মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে — কিসের বিনিময়ে কি পাচ্ছি আমরা ? অনেক যত্ন করে বড়ো করে কুমীরের মুখে ঠেলে দিচ্ছি । অমানুষেরা এই পেশায় কেনো আসে ? একটা সময়ে যেকোনো সমস্যা হলে মানুষ শিক্ষকদের কাছে যেতো –এতোটাই সম্মানের ছিলো , একজন শিক্ষক বন্দুকের নলের সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন – আমার ছেলেদের মারতে হলে আগে আমাকেই মারতে হবে ! এই শিক্ষকদের সংখ্যা শুন্যের কোঠায় অথবা বইয়ে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছেন । শিক্ষকদের একটা অংশ এখন ভাদ্র মাসের কুকুরের মতন ,তাই যত্রতত্র বাচ্চারা তাদের লালসার শিকার!

 

 

 

 

 

সভ্যতার সব বেড়া ডিঙ্গিয়ে শিক্ষক শব্দটা আজকাল ভয়ংকর যারা করছে তাদের কঠিন শাস্তি না দিলে সংক্রামিত হবে অন্যদের মাঝেও, একদিনে পরিবেশ এতো নীচুতে নামেনি। স্কুল ,কলেজ ,মাদ্রাসা – কোনো জায়গায় বাচ্চারা আর নিরাপদ নেই –এটাই সত্যিকার চেহারা। লুইচ্চামি করার জন্যে অন্য পেশায় চলে যান – শিক্ষকতায় কেনো আসেন ? পবিত্র জায়গাগুলোকে অপবিত্র করার অধিকার কে দিয়েছে আপনাদের? আমরা শিক্ষাকেন্দ্রে পাঠাই পড়াতে – যৌন নিগৃহ হতে নাহ! যেকোনো অন্যায় সেটা অন্যায়ই — সেখানে কাউকে আলাদা করে দেখার অবকাশ নাই। হারাম, হালালের কথা বলে মুখে ফেনা তুলবেন আর নিজেরাই এসব কাজে জড়াবেন — সেটাতো হবে না! নিজেরা অমানুষ হয়ে কি করে আলো ছড়াবেন? দাঁতাল শুয়োর সব ! আমাদের টাকায় নিজেদের ভাগ্য বদলাবেন আর আমাদের বাচ্চাদের সাথে এমন করার সাহস আসে কোত্থেকে? বিচারের দীর্ঘসুত্রিতা, অপরাধ করেও জামিনে মুক্তি পাওয়া, টাকার বিনিময়ে নিজেদেরকে মুক্ত করার এই খেলা চলছে অনেকদিন ধরেই তাই সাহসেরও পরিমাণ বেড়েছে। অন্যায়কারী স্কুল হোক আর মাদ্রাসাই হোক — অপরাধের মাত্রা এক’ই, নুরানি চেহারা হলেই অপরাধের মাত্রা কমে যায়না! যারা তারপরেও এসব অপরাধীর পক্ষে সাফাই গায় তারাও একই অপরাধী। দুই পাতার কিতাব পড়ে আর যাই হোক আমাদেরকে বুঝাতে আসবেন না।

 

 

 

 

 

পুলিশ, প্রশাসন, অভিভাবকদের এক হতে হবে — যেখানেই অন্যায় সেখানেই রুখে দাঁড়াতে হবে, ঘটনা ঘটার পর তদন্ত কমিটি দিয়ে পানি খামু? যে যার জায়গায় যদি দায়িত্ব পালন করেন – পত্রিকার সংবাদ হয়না বাচ্চারা। জবাবদিহিতা চাই সর্বক্ষেত্রেই — যারা এসব কুলাঙ্গারদের সাথে থাকবেন তাদেরকেও আইনের আওতায় আনতে হবে। সবচেয়ে ভালো হয় আলাদা আইন করা হোক এসব শিক্ষকদের জন্য, এদেরকে খোঁজা করে একটা চিড়িয়াখানায় রাখা হোক — আমরা বাচ্চাদের মানুষরূপী অমানুষ দেখাতে নিয়ে যাবো। সাংবাদিকরা ইচ্ছে করলে অনেককিছুই করতে পারেন — অতীতে তাই দেখেছি। আপনারা চাইলে অনেককিছুই সম্ভবপর, নিজেকে বিকিয়ে দেবার আগে ভাবুন – এরপর আপনার আপনজন হতে পারে লালসার শিকার। সবাই মিলে জাগুন, জেগে উঠুন – নোংরা হাতগুলো ভেঙে দিন।

(প্রকাশিত লেখা ও মন্তব্যের দায় একান্তই সংশ্লিষ্ট লেখক বা মন্তব্যকারীর, প্রথমবার্তা কর্তৃপক্ষ এজন্য কোনোভাবেই দায়ী নন।)