ইউছুফ আরমান:  ইতিকাফ আরবী শব্দ। যার অর্থ অবস্থান করা, বসা, বিশ্রাম করা, সাধনা করা, ধ্যান করা ইত্যাদি। রমজানের ২১তম রাত হতে ৩০তম রাত পর্যন্ত সাংসারিক যাবতীয় ঝামেলা হতে মুক্ত হয়ে মসজিদে ইবাদতের উদ্দেশ্যে অবস্থান করাকে ইতিকাফ বলে। রমজানের শেষ ১০ দিন মসজিদে ইতিকাফ করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদা-ই-কিফায়া। মহল্লার কোনো একজন ব্যক্তি ইতিকাফ পালন করলে সবার পক্ষ হতে আদায় হয়ে যায়। কেউ যদি ইতিকাফ না করেন তবে সবাই সুন্নাত ত্যাগের জন্য দায়ী থাকবে।

 

 

 

 

প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ (সা.) পবিত্র মাহে রমজানের শেষ ১০ দিন ইতিকাফ করতেন। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি সারাজীবনে একদিন হলেও ইতিকাফ করবেন, কিয়ামতের দিন জাহান্নাম তার কাছ থেকে ১৫শ’ বছর পথ দূরে থাকবে।’ লাইলাতুল কদরের অনুসন্ধান : ইতিকাফের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো, ‘লাইলাতুল কদর’ অনুসন্ধান করা। যে ব্যক্তি পবিত্র মাহে রমজানের শেষ ১০দিন ইতিকাফ করবেন, তিনি নিশ্চয়ই ‘লাইলাতুল কদরের’ ফজিলত লাভ করবেনই। ইতিকাফের নিয়ত : ইতিকাফের জন্য মসজিদে প্রবেশের সময় নিয়ত করে নিতে হয়। নিয়ত : ‘নাওয়াইতু আন সুন্নাতুল ইতিকাফ-মাদুমতু হাজাল মাসজিদ।’

 

 

 

 

এই নিয়ত করে মসজিদে প্রবেশ করে এক কোণে বিছানা বিছাতে হবে। যাতে নামাজী মুসল্লিদের যাতায়াত বা নামাজে কোনো ব্যাঘাত না ঘটে। ইতিকাফের শর্ত : ইতিকাফের শর্ত ৩টি। যথা- ১. যে কোনো মসজিদে নিয়মিত জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায় করা হয়, এরূপ কোনো মসজিদে পুরুষদের অবস্থান করতে হবে। মহিলারা আপন ঘরে পর্দার সঙ্গে ইতিকাফ করবে। ২. ইতিকাফের নিয়তে ইতিকাফ করতে হবে। কারণ বিনা নিয়তে ইতিকাফ হয় না। ৩. ইতিকাফকারীকে সর্বদা পাক-পবিত্র থাকতে হবে। ইতিকাফে করণীয় : ইতিকাফ অবস্থায় করণীয় হচ্ছে- ১. বেশি বেশি আল্লাহর জিকির-আজকার করা, ২. নফল নামাজ আদায় করা, ৩. কোরআন তেলাওয়াত করা, ৪. দ্বীনি ওয়াজ-নসিহত শোনা ও ৫. ধর্মীয় গ্রন্থাবলী পাঠ করা।

 

 

 

 

ইতিকাফের সময় কি কি কাজ করা যাবে এবং কি কি কাজ করা যাবে না এক. ইতিকাফের মধ্যে যেসব কাজ করা জায়েজ বা করা যাবে ১. প্রসাব পায়খানার জন্যে বাইরে যাওয়া জায়েয। মনে রাখতে হবে এসব প্রয়োজন এমন স্থানে পূরণ করতে হবে যা মসজিদের নিকটে হয়। ২. ফরয গোসলের জন্যেও ইতিকাফের স্থান থেকে বাইরে যাওয়া জায়েয। তবে মসজিদেই গোসল করার ব্যবস্থা থাকলে সেখানেই গোসল করতে হবে। ৩. খাওয়ার দাওয়ার জন্য মসজিদের বাইরে যাওয়া যায় যদি খাবার নিয়ে আসার কোনো লোক না থাকে। খাবার আনার লোক থাকলে মসজিদে খাওয়াই জরুরী।

 

 

 

 

৪. জুমা ও ঈদের নামাযের জন্যেও বাইরে যাওয়া জায়েয। ৫. যদি কোথাও আগুন লাগে অথবা কেউ পানিতে পড়ে ডুবে যাচ্ছে অথবা কেউ কাউকে মেরে ফেলছে অথবা মসজিদ পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা হয় তাহলে এসব অবস্থায় ইতিকাফের স্থান থেকে বাইরে যাওয়া শুধু জায়েযই নয় বরঞ্চ জরুরী। ৬. জুমার নামায আদায়ের জন্য বা কোনো প্রয়োজনীয় পুরণ করার জন্যে বের হলো এবং এ সময়ে সে কোনো রোগীর সেবা করলো অথবা জানাযায় শরীক হলো তাহলে তাতে কোনো দোষ হবে না।

 

 

 

 

৭. যে কোনো প্রাকৃতিক অথবা শরীয়াতের প্রয়োজনে মসজিদ থেকে বের হওয়া জায়েয। ৮. যদি কেনাবেচার কোনো লোক না থাকে এবং বাড়ীতে খাবার কিছু না থাকে তাহলে প্রয়োজনমত কেনাবেচা করা ইতিকাফ কারীর জায়েয। ৯. আযান দেয়ার জন্যে মসজিদের বাইরে যাওয়া জায়েয। ১০. ইতিকাফ অবস্থায় কাউকে দীন সম্পর্কে পরামর্শ অথবা চিকিৎসা সংক্রান্ত পরামর্শ দেয়া জায়েয। বিয়ে করা, ঘুমানো এবং আরাম করা জায়েয।

 

 

 

 

 

 

ইতিকাফে যেসব কাজ করা না জায়েজ বা অবৈধ ১. ইতিকাফ অবস্থায় যৌনক্রিয়া করা এবং স্ত্রীকে আলিঙ্গন করা হলে ইতিকাফ নষ্ট হবে। ২. ইতিকাফ অবস্থায় কোনো দুনিয়ার কাজে লিপ্ত হওয়া মাকরূহ তাহরিমী। বাধ্য হয়ে করলে জায়েয হবে। ৩. ইতিকাফ অবস্থায় একেবারে চুপচাপ বসে থাকা মাকরূহ তাহরিমী। যিকির ফিকির, তেলাওয়াত প্রভৃতিতে লিপ্ত থাকা উচিত। ৪. মসজিদে বেচাকেনা করা বা ঝগড়া ঝাটি করা, গীবত করা অথবা কোনো প্রকার অশ্লীল কথা বার্তা মাকরূহ।

 

 

 

 

 

 

৫. কোনো প্রাকৃতিক ও শরয়ী প্রয়োজন ব্যতিরেকে মসজিদের বাইরে যাওয়া অথবা প্রাকৃতিক ও শরয়ী প্রয়োজনে বাইরে গিয়ে সেখানেই থেকে যাওয়া জায়েয নয়। তাতে ইতিকাফ নষ্ট হয়ে যাবে। কোরআন-হাদিসে ইতিকাফ প্রসঙ্গেঃ- পবিত্র কোরআনের আয়াতে সূরা বাকারা : ১৮৭নং আয়াতে ইরশাদ করেছেন, আর তোমরা মসজিদে ইতিকাফকালে স্ত্রীদের সাথে মেলামেশা করো না নবীজি ইতিকাফকে খুব গুরুত্ব দিতেন। হজরত আয়েশা (রা.) বলেছেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রতি রমজানের শেষ দশক (মসজিদে) ইতিকাফ করতেন। এ আমল তাঁর ইন্তেকাল পর্যন্ত কায়েম ছিল।’ (বুখারি ও মুসলিম)।

 

 

 

 

লেখক পরিচিতি ইউছুফ আরমান কলামিষ্ট, সাহিত্যিক ফাজিল, কামিল, বি.এ অনার্স এম.এ, এলএল.বি দক্ষিণ সাহিত্যিকাপল্লী বিজিবি স্কুল সংলগ্ন রোড় ৬নং ওয়ার্ড, পৌরসভা, কক্সবাজার