প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক:  হাফপ্যান্ট পড়ে রাস্তায় যতবার ছেলেদের হাঁটতে দেখি আমার পুরুষের পর্দা সম্পর্কে ততবার মনে প্রশ্ন জাগে। মেয়েদের পর্দা, হিজাব নিয়ে কথা বলতে বলতে ফেনা তুলে ফেলা লোকদের কাউকে তেমন ছেলেদের পর্দা নিয়ে কথা বলতে দেখি না। কজন ছেলে তার নিজের পর্দা করে, এই প্রশ্নটি করা যেন তাদের কাছে আতে ঘা লাগার মত।

 

 

 

 

 

অথচ, ইসলামে খুব সুন্দরভাবে নারীর পর্দার প্রাধান্য দিয়েই পুরুষের পর্দার ব্যাপারটিও নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। একজন ছেলে যদি বেপর্দা কোন মেয়েকে পর্দা না করা নিয়ে প্রশ্ন করতে পারে তবে একজন মেয়েও তাকে প্রশ্ন করতে পারে রাস্তাঘাটে মেয়েদের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকা নিয়ে। মেয়েদের পর্দা পালন খুব গুরুত্বের সাথে বলা হয়েছে, এটা ঠিক এবং পালনীয়ও। সাথে সাথে কেন জানি ছেলেরা তাদের পর্দার ব্যপারে মারাত্নক অসচেতন।

 

 

 

 

 

খালি গায়ে সর্বসমক্ষে ঘুরে নিজের শরীর দেখানোটা বেপর্দা মেয়ের ঘোরাঘুরির থেকে কোন অংশে কম না। কিন্তু ছেলেদের নিয়ে কথা কম হয় কেন?অথচ, আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে আগে পুরুষের পর্দার কথাই বলেছেন। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘(হে নবী!) আপনি ঈমানদার পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং গোপন অঙ্গের হেফাজত করে। এতে তাদের জন্য উত্তম পবিত্রতা রয়েছে। নিশ্চয়ই তারা যা করে আল্লাহ এ ব্যাপারে জানেন। আর ঈমানদার নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং গোপন অঙ্গের হেফাজত করে।—সূরা নূর (আয়াত-৩০)

 

 

 

 

 

পর্দা দু’ভাগে বিভক্তঃ (১) চোখের পর্দা, (২) দেহের পর্দা। চোখের পর্দা নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই ফরজ। আর দেহের পর্দা বিশেষভাবে নারীর জন্য ফরজ। আর নারীদের পর্দা যাতে লঙ্ঘিত না হয় সেভাবে পুরুষদের চলে নারীদের পর্দা বজায় রাখতে সহায়তা করা পুরুষদের জন্য ফরজ। অপর দিকে ফরজ সতর আবৃত রাখার হুকুম পালন নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই ফরজ।

 

 

 

 

 

চোখের পর্দার ব্যাপারে বলা হয়েছে, প্রথমবার কোন পুরুষের দৃষ্টি চলতে ফিরতে কোন নারীর দিকে পড়লে সেটা দ্রুত সরিয়ে আর তাকানো যাবে না। বুরায়দা (রা.) কতৃক বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) একবার হজরত আলী (রা.)-কে বলেন, ‘হে আলী! তুমি দৃষ্টির পর দৃষ্টি ফেলো না। হঠাৎ অনিচ্ছাকৃতভাবে যে দৃষ্টি পড়ে তার জন্য তুমি ক্ষমা পাবে। কিন্তু পরবর্তী দৃষ্টি তোমার জন্য বৈধ নয়।’ (আহমাদ, তিরমিযী, আবুদাউদ, দারেমী, মিশকাত: ৩১১০)

 

 

 

 

 

দ্বিতীয়বার দেয়া দৃষ্টিকে শয়তানের দৃষ্টির সাথেও তুলনা করা হয়েছে। কেননা, শয়তান সবকিছুই আমাদের চোখে আরো আকর্ষণীয় আর মুগ্ধকরভাবে দেখায়। আমার এক বন্ধুর সাথে কথা বলছিলাম। সে মজা করে বলছিলো, দ্বিতীয়বার তাকানো যেহেতু নিষেধ তাই একবারই ভাল করে দেখে নেব। আমি তার কথায় অবাক হইনি বরং এই ভেবে অবাক হলাম, আমাদের চারপাশে এরকম অনেকে আছেন যারা এমনভাবে একটা মেয়ের দিকে তাকায় যে মেয়েটাই লজ্জা পেয়ে যায়। হয়তো সে ই আবার মেয়েদের পর্দা নিয়ে খুব সোচ্চার।

 

 

 

 

 

এবার আসি দেখা দেবার বিষয়ে। একজন নারী যেমন চাইলেই কোন পুরুষের সামনে আসতে পারে না, ইসলামে সুস্পষ্টভাবে পুরুষের ক্ষেত্রেও এমন কয়েকজন নারীর কথা নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে যাদের দেখা জায়েজ রয়েছে তারা হলেন: (১) মা (আপন ও সৎ উভয় ),
(২) দাদী, পরদাদী, (৩) নানী, পরনানী, (৪) মেয়ে ( বৈপিত্রেয়া, বৈমাত্রিয়া মেয়ে ও দুধ মেয়ে ), (৫) পুতনী ( দুধ ছেলে, বৈমাত্রেয়া ও বৈপিত্রেয় ছেলের মেয়ে ), (৬) নাতনী ( দুধ মেয়ে ও বৈপিত্রেয়া মেয়ের মেয়ে),

 

 

 

 

 

(৭) বোন (তিন প্রকার: আপন, বৈমাত্রিয়া বোন ও বৈপিত্রিয়া বোন ), (৮) ফুফু (আপন ফুফু, বৈমাত্রিয়া ফুফু, বৈপিত্রিয়া ফুফু ও দুধ ফুফু ), (৯) খালা (আপন খালা, বৈমাত্রিয়া খালা, বৈপিত্রিয়া ও দুধ খালা ) (১০) ভাতিজী, (১১) ভাগ্নী, (১২) দুধ মা (আড়াই বছরের মধ্যে যার দুধ পান করা হয়েছে), (১৩) দুধ বোন, (১৪) শাশুড়ী(শুধু আপন শাশুড়ী), (১৫) ঔরসজাত ও দুধ পুত্রের বধু বা স্ত্রী, এবং
(১৬) অতি বৃদ্ধা মহিলা, যাদের প্রতি তাকালে আকর্ষণ বিকর্ষণে পরিণত হয়।

 

 

 

 

 

 

অর্থাৎ এদের বাইরে হুটহাট কারো সাথে দেখা করার বিধানও নেই। আচ্ছা, তাহলে পুরুষদের জন্য সঠিক পর্দাটি কি?আমি অনেককে জিজ্ঞেস করে দেখেছি, সে ধর্মের অন্যান্য বিধান জানলেও পর্দার সম্পর্কে জানা ও মানার ব্যাপারে যথেষ্ট অসচেতন। ইসলামে পুরুষের পর্দা পালন করার নিয়ম-কানুন পবিত্র কোরআন ও সহীহ হাদীস সমূহে উল্লেখ করা হয়েছে। নিম্নে নিয়ম গুলো আলোচনা করা হলো-

 

 

 

 

 

(১) পুরুষের নাভীর ওপর থেকে হাঁটুর নিচে এবং টাকনুর ওপর পর্যন্ত ঢাকতে হবে। পুরুষের হাটুর ওপরে এবং টাকনুর নিচে কাপড় পরা কবিরা গুনাহ ।(২) এমন পোশাক পরিধান করবে, যা বিপরীত লিঙ্গের প্রতি যৌন আবেদনময় হবে না এবং বিকৃত চিন্তার জন্ম দিবেনা।

 

 

 

 

 

(৩) পোশাক এমন পাতলা হওয়া যাবেনা যাতে কাপড় পরা সত্বেও ওপর দিয়ে ভেতরের চামড়া নজরে আসে। কারণ এমন কাপড় পরা না পরা একই কথা।(৪) পোশাক হতে হবে ঢিলেঢালা এবং মার্জিত। এমন আঁট-সাঁট (টাইটফিট) হওয়া যাবেনা যাতে দেহের উঁচু-নিচু গঠন বোঝা যায় ।

 

 

 

 

 

(৫) পোশাকটি যেন কোনো অবিশ্বাসী/কাফেরদের অনুকৃত না হয়। প্রিয় নবীজী (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি যে জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন (পোশাকে, চাল-চলনে অনুকরণ) করবে, সে তাদেরই দলভুক্ত।’ (আবূ দাউদ, মিশকাত: ৪৩৪৭)

 

 

 

 

 

(৬) পোশাকটি যেন বিপরীত লিঙ্গের পোশাকের অনুরূপ না হয়। এ সম্পর্কে মহানবী (সা.) বলেছেন-সেই সমস্ত নারীদেরকে অভিশাপ দিয়েছেন, যারা পুরুষদের বেশ ধারণ করে এবং সেই সমস্ত পুরুষদেরকেও অভিশাপ দিয়েছেন, যারা নারীদের বেশ ধারণ করে। (আবূ দাউদ: ৪০৯৭, ইবনে মাজাহ: ১৯০৪)

 

 

 

 

 

(৭) পোশাক যেন জাঁকজমকপূর্ণ বিলাসবহুল না হয়। কারণ, এমন ধরনের পোশাক পরলে সাধারণত পরিধানকারীর মনে অহংকারের সৃষ্টি হয়। তাই মহানবী (সা.) বলেন- ‘যে ব্যক্তি দুনিয়াতে প্রসিদ্ধিজনক পোশাক পরবে, আল্লাহ্ তাকে কিয়ামতের দিন লাঞ্ছনার পোশাক পরাবেন। (আহমাদ, আবূ দাউদ, ইবনে মাজাহ, মিশকাত: ৪৩৪৬)

 

 

 

 

 

শেষকথা বলি, মনোবিজ্ঞানে একটি সূত্র আছে, সেটি হচ্ছে -Stimulus and Response অর্থাৎ ‘উদ্দীপনা ‘ এবং ‘প্রতিক্রিয়া’। যেখানে উদ্দীপনা আছে সেখানে প্রতিক্রিয়া হবেই। মনোবিজ্ঞানের মতে, বস্ত্রহীন কোন নারীর প্রতি যদি কোন পুরুষ দৃষ্টিপাত করে, তবে ঐ নারী একধরনের যৌন সুড়সুড়ি অনুভব করবে। ফলে ঐ নারীর দেহে যৌন উত্তেজনা জন্ম নেয়।

 

 

 

 

 

এই অবস্থায় নারী পুরুষ উভয়ের দৈহিক হরমোনের তারতম্য ঘটে। যা নারী পুরুষ উভয়ের জন্য ক্ষতিকর৷ তাই ইসলাম তথাকথিত বিবস্ত্র প্রথাকে পরিহার করে পর্দা প্রথার প্রতি গুরুত্ব দিয়েছে। আর নারীর পাশাপাশি পুরুষের সেক্ষেত্রে অনেক বড় ভূমিকা রাখার আছে।