প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক:     খুলনার ভিন্ন ধারার এক শিক্ষাদান কেন্দ্র কমরেড রতন সেন কলেজিয়েট গার্লস স্কুলের গল্প শোনাচ্ছেন গৌরাঙ্গ নন্দী দুপুর ১টা বেজে ১০ মিনিট। ঘণ্টায় চারটি শব্দ হলো। ক্লাসগুলো থেকে ছাত্রীরা বেরিয়ে এসে চলে গেল নির্দিষ্ট একটি জায়গায়, যেখানে প্লেটগুলো ঢিবি করে রাখা আছে।

 

 

 

 

 

প্রত্যেকেই একটি করে প্লেট তুলে নিল। কলতলায় প্লেট ও হাত ধুয়ে আবারও খাবার রাখার জায়গায় সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াল। তারপর খাবার নিয়ে ক্লাসের নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে একসঙ্গে বসে খাওয়া। সপ্তাহে ছয় দিন ক্লাস হয়। এই ছয় দিনই দুপুরে খাবার পরিবেশিত হয়। সাধারণ মানের খাবার। শনিবার সবজি, ভাত; রবিবার ডাল আর ভাত; সোমবার মাছ আর ভাত; মঙ্গলবার সবজি, ভাত; বুধবার ডাল, ভাত এবং বৃহস্পতিবার সবজি খিচুড়ি।

 

 

 

 

 

এটি স্কুলে মিডডে মিলের মতো একটি ব্যবস্থা হলেও শুরু হয়েছিল অজপাড়াগাঁয়ে গরিব পরিবারের মেয়েদের স্কুলমুখী করার একটি কৌশল হিসেবে। সময়টা ২০০৯ সাল। রূপসা উপজেলার ডোমরা ও আশপাশের গ্রামে মেয়েদের কোনো স্কুল ছিল না। আর এলাকার বেশির ভাগ মানুষ গরিব হওয়ায় ছিল নুন আনতে পান্তা ফুরোয় দশা।

 

 

 

 

 

পরিবারের কর্তারা এ কারণে মেয়েদের স্কুলে পড়ানোর কথা ভাবতেন না। কেউ কেউ বিনা বেতনের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠাত, তবে ওই পর্যন্তই। অল্প বয়সেই মেয়েদের বিয়ে দিয়ে পরের ঘরে পাঠানোই ছিল লক্ষ্য। সেই জায়গায় একটি ভিন্ন ধারার স্কুল তৈরি করে এলাকার খোলনলচে বলতে গেলে পাল্টে দিয়েছেন কয়েকজন রতনভক্ত। এখন উপজেলা নয়, জেলায়ও রতন সেন স্কুলের সুনাম ছড়িয়েছে।

 

 

 

 

 

শুরুর কথা: সমাজতান্ত্রিক আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে রাজনৈতিক জীবন শুরু করেছিলেন রতন সেন। ১৯৪৭ সালের পর পরিবারের সব সদস্য ভারতে চলে গেলেও রাজনীতির কারণেই তিনি এ দেশে থেকে যান। খুবই সাধারণ খাবার এবং অতি সাধারণ পোশাক পরে সারা জীবন রাজনীতি করেছেন। কৃষক-শ্রমিকদের সংগঠিত করার চেষ্টা করেছেন। দলের প্রয়োজনে-সিদ্ধান্তে শিক্ষকতা করেছেন। পাশের আজগড়া স্কুলেও তিনি শিক্ষকতা করেছেন। ১৯৯২ সালের ৩১ জুলাই ডোমরা গ্রামের এই বাড়ি থেকে বের হয়ে খুলনা শহরে গিয়েছিলেন, পথিমধ্যে খুলনা ডিসি অফিসের সামনে দুর্বৃত্তরা তাঁকে খুন করে। সর্বস্বত্যাগী এই মানুষটির স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখতে তাঁর ভক্ত-অনুসারীরা স্কুলটি গড়ে তোলেন।

 

 

 

 

 

তখন ২০০৯ সাল। কিভাবে রতন সেনের স্মৃতিকে ধরে রাখা যায়—ভাবছিলেন তাঁর ভক্ত স ম লিয়াকত। রতন সেন যে পোড়ো বাড়িটিতে থাকতেন, সেটি তখন দখলদাররা গ্রাস করতে উদ্যত। দলের একজন শুভানুধ্যায়ী ছিলেন রাখাল বোস। তিনি দলকে তাঁর সম্পত্তি দিয়ে গিয়েছিলেন। রাখাল বোসের ওই বাড়িতে থাকতেন রতন সেন। বাড়িটি একতলা। পুরনো আমলের কড়ি-বরগার তৈরি। পাশে বিশাল পুকুর, অনেক গাছপালা। তিনি শুধু রাতটুকু বাড়িটিতে কাটাতেন। তার পরই স ম লিয়াকতের মাথায় আসে সেই বাড়িটিতেই স্কুল গড়ে তোলার কথা। গড়ে তোলা হয় কমরেড রতন সেন কলেজিয়েট গার্লস স্কুল।

 

 

 

 

 

ছাত্রী জোগাড় করা দায়:  স্কুল তো হবে। কিন্তু শিক্ষার্থী কিভাবে জোগাড় হবে। স ম লিয়াকত, তাঁর আরো কয়েকজন বন্ধু নিয়ে এলাকায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের তাদের মেয়েদের ওই স্কুলে পাঠানোর অনুরোধ করেন; কিন্তু বেশির ভাগ অভিভাবকই এতে নারাজ। কোনোমতে প্রাইমারি স্কুল পাস করিয়ে তাঁরা ক্ষান্ত দিয়েছেন।

 

 

 

 

 

কিভাবে স্কুলে পড়াশোনার খরচ চালাবেন? গরিব শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করে স্কুলটি সম্পূর্ণ অবৈতনিক এবং ছাত্রীদের স্কুলের পোশাক, জুতা, বই-খাতা, কাগজ-কলমও সরবরাহ করার সিদ্ধান্ত হলো। তিনি মানুষকে বোঝাতে লাগলেন, ওই স্কুলে গেলে মেয়েদের কোনো খরচ লাগবে না।

 

 

 

 

 

 

মেয়েরা লেখাপড়া শিখবে, এমনকি দুপুরের খাবারও দেওয়া হবে। মেয়েরা যাতে বাড়িতে পড়াশোনা করতে পারে, সে জন্য হারিকেন এবং প্রয়োজনীয় কেরোসিন তেল কিনেও সরবরাহ করা হলো। বর্ষায় যাতে স্কুলে আসা-যাওয়ায় বিঘ্ন না ঘটে, সে জন্য ছাতা সরবরাহ করা হলো। এভাবেই জোগাড় হলো ৩৩ জন শিক্ষার্থী, যাদের নিয়ে ষষ্ঠ শ্রেণির যাত্রা শুরু।

 

 

 

 

 

দশ বছরের পথ চলায়:  খুলনা মহানগরীর জেলখানা ঘাট পার হয়ে পূর্ব দিকের পিচঢালা পথ বেয়ে প্রায় সাত কিলোমিটার গেলে ছোট একটি বাজার। পালেরহাট বাজার। সেখান থেকে ৪০০ গজের মতো এবড়োখেবড়ো ইটের সলিংয়ের রাস্তা পেরোলেই পৌঁছে যাবেন স্কুলের সীমানায়। এরই মধ্যে এক দশক পার করেছে স্কুলটি।

 

 

 

 

 

২০১৫ সালে এই স্কুলের শিক্ষার্থীরা প্রথমবার এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। শতভাগ শিক্ষার্থী কৃতকার্য হয়। কলেজ সেকশন খোলা হয় পরে। ২০১৯ সালে এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা প্রথম এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। শিক্ষার্থী জোগাড় করার জন্য এখন আর বাড়ি বাড়ি যেতে হয় না। কমরেড রতন সেন কলেজিয়েট গার্লস স্কুলে শিক্ষার্থীরা আসে।

 

 

 

 

 

বর্তমানে শিক্ষার্থীসংখ্যা ২৭০। শুধু বইয়ের পড়াশোনা নয়, খেলাধুলায়ও স্কুলটি বেশ নাম করেছে। উপজেলা স্তরের নানা প্রতিযোগি-তায় অংশ নিলেই বলা হয়—ও, রতন সেনের মেয়েরা, তারা তো ভালো করবেই। মেয়েরা ব্যাডমিন্টন, কাবাডি, ভলিবল, হ্যান্ডবল, ক্রিকেট খেলায় পটু। উপজেলা পর্যায়ে এই স্কুলের কাবাডি দল দুইবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। স্কুলের জায়গায় শাকসবজিরও চাষ করেছে তারা।

 

 

 

 

 

 

 

শিক্ষার্থীরাও স্কুলটিকে বড় আপন করে নিয়েছে। কথা হলো হালিমা আক্তার যুথি ও উর্মি খাতুনের সঙ্গে। এখন ক্লাসের পড়া নেই; কিন্তু ছুটে এসেছে স্কুলে। স্কুলের লাইব্রেরিতে কম্পিউটার নিয়ে তারা কাজ করছিল। তারা দুজন ভালো ক্রীড়াবিদও। উপজেলা স্তরের হ্যান্ডবল প্রতিযোগিতায় তারা নিয়মিত অংশ নেয়। যুথি-উর্মি দুজনই বলে, ‘এই স্কুলটি আমাদের দ্বিতীয় পরিবার। শিক্ষকরা আমাদের অভিভাবক। এখানে এসে পড়াশোনার পাশাপাশি আমরা শৃঙ্খলা শিখেছি।

 

 

 

 

 

খেলাধুলা শিখেছি। আমাদের এলাকায় বাল্যবিয়ে কথাটি আর শোনা যায় না। বাড়িতে খাওয়া-পরা চললেও বই কেনার বাড়তি সামর্থ্য নেই, তাই স্কুলে এসে পড়াশোনা করি; কম্পিউটারে কাজ শিখি।’সবারই এক কথা। বাড়িতে খাওয়া-পরা হয়তো চলত; তবে স্কুলে না এলে এত দিনে বিয়ে হয়ে যেত। এখন পরিবারের কেউ বিয়ে নিয়ে চাপাচাপি করে না। পড়াশোনার জন্য খুব একটা বাড়তি খরচও হয় না।

 

 

 

 

 

কিভাবে খরচ জোগানো হয়: স্কুল থেকেই শিক্ষার্থীদের পোশাক, বই-খাতা সরবরাহ করা ছাড়াও অবকাঠামো, শিক্ষকদের বেতন-ভাতা প্রভৃতি কী করে জোগাড় করা হয় খোঁজ নিলাম। জানা যায়, প্রাথমিকভাবে স্কুলটি গড়ে তোলা এবং পরিচালনার ব্যয় রতন সেনের গুণমুগ্ধরাই জোগাড় করেছেন। ছাত্র ইউনিয়ন খুলনা জেলা শাখার সাবেক নেতা শামীম আহমেদ, যিনি আমেরিকাপ্রবাসী, তিনিই প্রাথমিকভাবে অর্থ জুগিয়েছিলেন।

 

 

 

 

 

শামীম আহমেদ ছাড়া অন্য বন্ধুরাও এখনো সহযোগিতা করে চলেছেন। দিন দিন খরচ বাড়ছে। ভালো বেতন-ভাতা দিতে না পারার কারণে অনেকেই এখানে শিক্ষকতা শুরু করলেও এখন অন্য স্কুলে চলে গিয়েছেন। যাঁরা আছেন, তাঁরা স্কুলটিকে ভালোবেসেই আছেন। পুরনো স্কুলবাড়িটির তিনটি কক্ষ। একটি লাইব্রেরি তথা শিক্ষকদের বসার কক্ষ। আর দুটি শ্রেণিকক্ষ। এখন আর ওই ভবনের কক্ষে ক্লাস হয় না। এখন সেখানে অফিস।

 

 

 

 

 

ক্লাস নেওয়ার জন্য আলাদা দুটি টিনের চাল আর দরমার বেড়া দেওয়া ঘর তৈরি করা হয়েছে। আরো তৈরি হয়েছে একটি ত্রিতল ভবন। ভবনের দেয়াল, অঙ্গসজ্জা হয়নি; শুধু একের পর এক ছাদ উঠেছে। শহীদুল্লাহ অ্যাসোসিয়েটসের প্রধান প্রকৌশলী শহীদুল্লাহর সহায়তায় এই তিনতলার কাঠামোটি গড়ে উঠেছে। আছে রান্নাঘর। যেখানে প্রতিদিন দুপুরের খাবার তৈরি ও বিতরণ করা হয়। ইউনিসেফ, রোটারি ক্লাব, ওয়ার্ল্ডভিশন প্রভৃতি সংগঠনও তাদের সাধ্যমতো সহায়তা করে চলেছে স্কুলটিকে। এই স্কুলের শিক্ষার্থীদের বাইরের শিক্ষক রেখে পড়া তৈরি করার প্রয়োজন হয় না।

 

 

 

 

 

শিক্ষকরা খুবই যত্ন করে ক্লাসেই তাদের পড়া তৈরি করে দেন। তবে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নিতে ভালো প্রস্তুতির জন্য স্কুল থেকেই অতিরিক্ত ক্লাস নেওয়া হয়। এ জন্য শিক্ষার্থীদের থেকে প্রতি মাসে ২০০ টাকা ফি নেওয়া হয়। আর ক্লাসের পরীক্ষার সময় অতি সামান্য ফি নেওয়া হয়।  স্কুলের প্রধান উদ্যোক্তা স ম লিয়াকতও মারা গেছেন ২০১৭ সালে। সবার সহযোগিতায় স্কুলটি এখনো চলছে, তবে আর্থিক অনটন বেশ। শিক্ষকরা বেশ কয়েক মাসের বেতন পাননি। তাঁরা হাসিমুখেই সব কিছু মেনে নিচ্ছেন। মানুষের সহায়তায় যে স্কুলটি গড়ে উঠেছে, টিকে আছে, তা সব বাধা অতিক্রম করে টিকে থাকবে বহু বছর—এটাই সবার প্রত্যাশা।