ব্যর্থতা ও নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগে শিগগিরই ভেঙে দেয়া হচ্ছে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপির আংশিক কমিটি। এ ব্যাপারে দলটির নীতিনির্ধারকরা নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

নতুন কমিটি গঠনের প্রক্রিয়াকে সামনে নিয়ে এগোচ্ছেন তারা। কেউ কেউ চাচ্ছেন, বর্তমান কমিটি ভেঙে দিয়ে আহ্বায়ক কমিটি করতে। তবে এর বিরোধিতা করছেন অনেকেই। তাদের মতে, আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হলে তা আবার ঝুলে যেতে পারে। তাই সরাসরি পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার পক্ষে তারা।
এ ক্ষেত্রে ব্যর্থ ও আত্মগোপনে থাকা নেতাদের বাদ দিয়ে যারা দলীয় কার্যক্রমে সময় দিতে পারবে এমন নেতাদের সমন্বয়ে কমিটি করতে সুপারিশ তাদের। এ ক্ষেত্রে প্রাধান্য পাবে তরুণরা।

ব্যর্থতার কারণে বারবার নতুন নেতৃত্ব আনার পরও গতি আসছে না মহানগর বিএনপিতে। সাবেক সভাপতি সাদেক হোসেন খোকাকে সরিয়ে দলের প্রভাবশালী নেতা মির্জা আব্বাসকে আহ্বায়ক করে শক্তিশালী কমিটি করা হলেও তারাও ব্যর্থ হন। সবশেষ ২০১৭ সালের ১৮ এপ্রিল মহানগরকে দুই ভাগ করে নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়। দলের যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেলকে সভাপতি ও সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর কাজী আবুল বাসারকে সাধারণ সম্পাদক করে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির ৭০ সদস্যের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল।

আর এমএ কাইয়ুমকে সভাপতি ও আহসানউল্লাহ হাসানকে সাধারণ সম্পাদক করে ঘোষণা করা হয় উত্তরের কমিটি। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, বিএনপির মহানগর কমিটিগুলোর মেয়াদ দুই বছর। সে হিসাবে, এসব কমিটির মেয়াদ ইতিমধ্যে শেষ হয়ে গেছে। ঘোষণার সময় নির্দেশনা ছিল, এক মাসের মধ্যেই পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে হবে। কিন্তু দিন মাস বছর গড়িয়ে কমিটিরই মেয়াদ ফুরিয়ে গেছে- পূর্ণাঙ্গ কমিটি আর হয়নি। শুধু তাই নয়, দুই সিটির যেসব থানা ও ওয়ার্ডের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল সেগুলোও পূর্ণাঙ্গ হয়নি।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যুগান্তরকে বলেন, সারা দেশে আমরা কমিটিগুলো আপডেট করছি। যেসব সাংগঠনিক জেলা কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে সেগুলো পুনর্গঠন করা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে ঢাকা মহানগর বিএনপির কমিটিও পুনর্গঠন করা হবে।

তিনি বলেন, সাংগঠনিকভাবে ঢাকা মহানগর দলের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। তাই এসব কমিটি ভেঙে ও নতুন কমিটি করার ক্ষেত্রে আমাদের বেশ সতর্ক থাকতে হয়। সবকিছু বিবেচনা করে যথাসময়ে আমরা এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেব। তৃণমূল নেতাকর্মীদের চাহিদা প্রাধান্য দিয়ে তরুণ, যোগ্য ও ত্যাগীদের সমন্বয়ে কমিটি করা হবে।
নেতাকর্মীদের অভিযোগ, রাজপথের আন্দোলন কিংবা সাংগঠনিক কার্যক্রম- কোথাও নেই ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপি। গুরুত্বপূর্ণ এই দুই সাংগঠনিক ইউনিটকে শক্তিশালী করার জন্য কেন্দ্র থেকে নেয়া কোনো উদ্যোগেই সফলতা মেলেনি। বরং কোন্দলে আরও বিপর্যস্ত হয়েছে নগর বিএনপি। গত জাতীয় নির্বাচনের সময় কোনো আন্দোলন কিংবা নির্বাচনী কার্যক্রম জমিয়ে তুলতে পারেনি দলটি।

এর অন্যতম কারণ হিসেবে নেতাকর্মীরা জানান, দুই সিটির শীর্ষ নেতাদের কেউ কেউ দীর্ঘদিন ছিলেন কারাগারে। আবার কেউ কমিটি ঘোষণার আগ থেকেই আত্মগোপনে। উত্তরের সভাপতি এমএ কাউয়ুম সভাপতি হওয়ার আগ থেকেই বিদেশে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। সাধারণ সম্পাদক হাসান মামলার অজুহাত দেখিয়ে থাকেন আত্মগোপনে। দীর্ঘদিন কারাভোগের পর সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছেন দক্ষিণের সভাপতি সোহেল। শীর্ষ নেতৃত্বের এমন দশায় দলীয় কার্যক্রমে নেই কোনো গতি। তাদের অনুপস্থিতিতে থানা ও ওয়ার্ডের কমিটি পুনর্গঠন এবং সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডও থমকে যায়। তৃণমূল নেতাকর্মীদের অভিযোগ, কমিটি ঘোষণার আগ থেকেই দলের হাইকমান্ডকে এ ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছিল।

যারা দেশে নেই কিংবা নিজেকে বাঁচানোর জন্য পালিয়ে বেড়াচ্ছেন তাদের যেন শীর্ষ পদে না আনা হয়। কিন্তু সে সময় দলের হাইকমান্ড আমাদের দাবিগুলো গুরুত্ব দেয়নি। আজ দল তাদের ভুল সিদ্ধান্তের মাশুল দিচ্ছে। তাদের মতে, নগর কমিটি নিয়ে কেন্দ্রীয় পর্যায়েও সমন্বয়হীনতা রয়েছে। কেন্দ্র থেকে নগরের কার্যক্রম কখনও তদারক করা হয়নি। ফলে কমিটি নিয়ে কেন্দ্রীয় নির্দেশনা কেবল কাগজে কলমেই রয়ে গেছে।

নানা প্রতিবন্ধকতার পরও দুই সিটির কিছু থানা ও ওয়ার্ড কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু তা নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ। যোগ্য ও ত্যাগীদের বাদ দিয়ে প্রায় সব জায়গায় পকেট কমিটি করা হয়েছে। যার ফলে অনেকেই ক্ষুব্ধ হন। এর প্রতিবাদে আন্দোলনও করেন মহানগর নেতাকর্মীরা। সাংগঠনিক কার্যক্রম না থাকায় অনেকেই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন।

আবার কেউ কেউ সংগঠন থেকে পদত্যাগও করছেন। শারীরিক ও পারিবারিক কারণ দেখিয়ে ঢাকা মহানগর উত্তরের সহ-সভাপতি মোহাম্মদ শাহাবউদ্দিন ও দক্ষিণের সহসভাপতি আবদুল মোতালেব পদত্যাগ করেছেন। অব্যাহতি চেয়েছেন কোতোয়ালি থানা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মোল্লা সাইফুল ও ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম বাচ্চু।

জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কাজী আবুল বাসার যুগান্তরকে বলেন, একাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে পরিস্থিতি প্রতিকূল ছিল। পাশাপাশি সভাপতি কারাগারে থাকার কারণে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, পূর্ণাঙ্গ কমিটি এবং পরবর্তী করণীয় নিয়ে শিগগিরই বৈঠক ডাকা হবে। সেখানেই আমরা সিদ্ধান্ত নেব। এ ব্যাপারে কেন্দ্রের পরামর্শ নেয়া হবে বলেও জানান এই নেতা।