প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক:গত ২৬ জুন সকালে বরগুনা সরকারি কলেজের রাস্তায় স্ত্রীর সামনে শাহনেয়াজ রিফাত শরীফকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে। এর পর থেকেই সবকিছু যেন নানা নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। ও্‌ই দিনই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান রিফাত। পরবর্তিতে তাঁর স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্যে নেওয়ার পর তাকে আসামি দেখিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়।

 

 

সময়ের সঙ্গে ঘটনার অন্তরালের অনেক কিছুই বেরিয়ে আসছে। বরগুনা হাসপাতাল থেকেই মিন্নির পরিবারের প্রতি ফাঁদ পাতা হয়। মিন্নির বাবার টাকায় বরগুনা থেকে বরিশালের উদ্দেশে অ্যাম্বুল্যান্স ভাড়া করা হয়। বরিশালে রিফাতের চিকিৎসার সব খরচ তিনিই বহন করেন। বিকেলে রিফাতের মৃত্যু ঘটে। খবর পেয়ে মিন্নির চাচাশ্বশুর আব্দুস সালাম শরীফ রাতে সেখানে আসেন।

 

 

পরের দিন সকালে জামাইয়ের লাশ গ্রামের বাড়িতে নেওয়ার জন্য মিন্নির বাবা অ্যাম্বুল্যান্স ভাড়া করেন। লাশ ওঠানোর আগে মিন্নির বাবার সঙ্গে জন খারাপ আচরণ করেন। জনের সঙ্গে থাকা বন্ধুরা শের-ই-বাংলা মেডিক্যালের লাশকাটা ঘরের সামনে মিন্নির বাবাকে লাঞ্ছিত করে। এমনকি তাঁকে অ্যাম্বুল্যান্স থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়।

 

 

মিন্নির বাবা বিকল্প পরিবহনে বরগুনায় পৌঁছান। তার আগেই রিফাতের লাশ তাঁর বাবার বাসা বড়লবণগোলা গ্রামে পৌঁছায়। মিন্নির পরিবার লাশ দেখতে রিফাতের বাসায় যায়।বড়লবণগোলা গ্রামের বেল্লাল হোসেন রিফাতের দূরসম্পর্কের আত্মীয়। তিনি বলেন, ‘২৭ জুন বিকেল তখন ৪টা হবে। ওই সময় মিন্নি তাঁর পরিবারের সঙ্গে রিফাতের বাসায় প্রবেশ করছিলেন। তখন রিফাতের বন্ধুরা জনের নেতৃত্বে মিন্নির পরিবারকে বাধা দেয়।’

 

 

বেল্লাল ঘটনা বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ‘জনের বিশেষ ভূমিকার কারণে সেখানকার পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে সেখানকার নারী-পুরুষ মিন্নির পরিবারের দিকে তেড়ে আসে। লাঞ্ছিত হওয়ার ভয়ে মিন্নির পরিবার রিফাতের বাসার লাগোয়া তাঁর চাচা আব্দুস সালামের বাসার দোতলায় গিয়ে আশ্রয় নেয়। রিফাতের জানাজার আগে-পরে তাঁর লাশ দেখার জন্য জনের কাছে অনুনয়-বিনয় করেন মিন্নি। কিন্তু মিন্নিকে তাঁর স্বামীর লাশ দেখতে দেওয়া হয়নি। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে মিন্নির শ্বশুরের সহযোগিতায় তাঁরা ওই বাসা থেকে বের হন।

 

 

খুনের ঘটনার পরের দিন রিফাতের বাবা দুলাল শরীফ বাদী হয়ে বরগুনা সদর থানায় ১২ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় মিন্নিকে প্রধান সাক্ষী করা হয়। কিন্তু মামলা দায়েরের আগে মিন্নির সঙ্গে তাঁর শ্বশুর কোনো যোগাযোগ করেননি। এদিকে এমপিপুত্র সুনাম দেবনাথ ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে মিন্নিকে খলনায়ক বানানোর চেষ্টা করেন। তিনি লিখেছিলেন, ‘এখন যাকে মিডিয়া হিরো বানাচ্ছে, সে-ই এ ঘটনার ভিলেন হতে পারে।’ এ নিয়ে কালের প্রথমবার্তার প্রতিবেদনের পর সুনাম দেবনাথ তাঁর স্ট্যাটাসের ওই অংশটুকু মুছে ফেলেন।

 

 

২৮ জুন সকালে এ প্রতিবেদক রিফাত শরীফের বাসায় যান। তখন রিফাতের চাচাশ্বশুর বরগুনা পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর আবু সালেহ ও তাঁর স্ত্রী সেখানে ছিলেন। রিফাতের মা, বাবা আর বোনও ছিলেন। তখন রিফাতের বাবা বলেন, পুলিশের কাছে থাকা ভিডিও ফুটেজ দেখে জনের সহযোগিতায় আসামিদের শনাক্ত করে তিনি মামলা দায়ের করেছেন। ছেলেকে চিকিৎসা থেকে শুরু করে কবর দেওয়ার কাজটিও জন করেছে। জনের সঙ্গে রিফাতের খুব ভালো সম্পর্ক ছিল।

 

 

দুলাল শরীফের দাবি, ঘটনার সময় জন থাকলে রিফাতের ওই ঘটনা ঘটত না। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আসামিদের সঙ্গেও একসময় জনের ভালো সম্পর্ক ছিল। মাদক কারবার নিয়ে বিরোধের জের ধরে তাদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়। মামলায় জনকে সাক্ষী করা হয়েছে।

 

 

দুই পরিবারের সঙ্গে কথা বলে যানা গেছে, ঘটনার পর রিফাতের কাছের আত্মীয় বলতে মিন্নির বাবাই সব সময় কাছে ছিলেন। কিন্তু মামলায় মিন্নির বাবাকে সাক্ষী করা হয়নি। উল্টো রিফাতের দুই চাচার নাম সাক্ষীর তালিকায় রাখা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে আব্দুস সালাম শরীফ রিফাত নিহত হওয়ার পর শের-ই-বাংলা হাসপাতালে আসেন। অপর চাচা আ. আজিজ শরীফ ঘটনা সম্পর্কে অবগত ছিলেন না।

 

 

এজাহার ঘেঁটে জানা গেছে, বরগুনা পৌরসভার প্যানেল মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক রইসুল আলম রিপনের ছেলে মনজুরুল আলম জন ছাড়া ১০ সাক্ষীর আটজনই রিফাতের গ্রামের বাড়ি উত্তর বড়লবণগোলা গ্রামে। তাঁদের অধিকাংশই রিফাতের আত্মীয়, যারা রিফাতকে কোপানোর সময় ঘটনাস্থলে ছিলেন না।

 

 

মামলার প্রধান আসামি নয়ন ২ জুলাই ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়। ওই দিন সকালেই সংসদ সদস্য শম্ভু নিহত রিফাত শরীফের বাড়িতে যান। তিনি রিফাতের পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন। সে ঘটনার একটি ভিডিও কালের কণ্ঠ’র হাতে রয়েছে। ওই ভিডিওতে দেখা যায়, রিফাতের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে শম্ভু বলছেন, ‘দুটি আইন পাসের জন্য সংসদে উপস্থিত থাকতে হয়েছে। সে কারণেই আমি ঘটনার সময় আসতে পারিনি।

 

 

তবে ঘটনার পর থেকেই রিফাতের বাবার সঙ্গে আমি নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছি। মামলা করতে দেরি হচ্ছে কেন? দ্রুত মামলা করার জন্য আমি তাঁকে বারবার বলেছি। সে যথাযথভাবে মামলাটি করেছে। মামলায় যদিও সে (রিফাতের বাবা) একটা নির্দিষ্টসংখ্যক আসামি দিয়েছে। কিন্তু আমি মনে করি, আরো অনেক লোক এর সঙ্গে জড়িত। এর পেছনে একটা গ্রুপ আছে।’ ওই সময় রিফাতের বাবাকে এমপির ডান পাশে দাঁড়ানো দেখা যায়।