প্রথমবার্তা প্রতিবেদক:   যুক্তরাষ্ট্রের দুই নারী কংগ্রেস সদস্য রাশিদা তালেব ও ইলহান ওমরের সফর বাতিল করে ইসরাইল । কিন্তু ইসরাইল প্রসঙ্গে এই দুই নারী কী বলেছেন যার ফলে তাদের প্রবেশাধিকার বাতিল করলো দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু?২০১৮ সালের নভেম্বরের নির্বাচনে মার্কিন কংগ্রেসে বিজয়ী হওয়ার মধ্য দিয়ে রাশিদা তালেব ও ইলহান ওমর আমেরিকার ইতিহাসে প্রথম মুসলিম নারী হিসেবে আসন জয়ের ইতিহাস রচনা করেন।

 

 

 

 

 

দুইজনই ডেমোক্রেট দলের সদস্য এবং তারা এই রাজনৈতিক দলটির প্রগতিশীল ধারার রাজনীতির সাথে দারুণভাবে মানানসই।তাদের অবস্থান এলজিবিটি সম্প্রদায়ের মানুষদের অধিকারের পক্ষে, গর্ভপাত বৈধ করার আইন রক্ষায় এবং তারা অভিবাসনের সমর্থনে উচ্চকণ্ঠ।কিন্তু একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে তাদের অবস্থান কংগ্রেসে তাদের নিজ দল এবং রিপাবলিকান সদস্য সবার থেকে ভিন্ন, আর তা হলো : ইসরাইল।

 

 

 

 

 

ইসরাইল বর্জন বিতর্ক: এই দুজন নারীই ফিলিস্তিন ইস্যুতে ইসরাইলে ভূমিকার কড়া সমালোচক। এবং কংগ্রেসে কেবলমাত্র এই দুইজন রাজনীতিবিদই জনসম্মুখে ফিলিস্তিন-নেতৃত্বাধীন ‘ইসরাইল বয়কট মুভমেন্ট’কে সমর্থন দিয়েছেন।আর এটাই এখন তালেব এবং ওমরকে পরিণত করেছে আমেরিকার ইতিহাসে প্রথম কোনো নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে যাদের ইসরাইলে প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা দেয়া হল।

 

 

 

 

 

এই বিষয়টি তাদের কংগ্রেসরে অন্য ৭২ জন সহকর্মীর বিপরীতে দাড় করিয়েছে যারা এই মাসের শুরুতে ইসরাইলে সেদেশ সফর করে এসেছে- লবিস্টদের পৃষ্ঠপোষকতায় বার্ষিক অনুষ্ঠানে অংশ নিতে।ইলহান ওমর ও রাশিদা তালেব ফিলিস্তিন ভূ-খণ্ডে পূর্ব জেরুসালেম এবং পশ্চিম তীর সফরে যাওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন। প্রকৃতপক্ষে কংগ্রেস সদস্য রাশিদা তালেবের জন্য এই সফর একটা পারিবারিক ভ্রমণও ছিল।

 

 

 

 

 

৪২ বছর বয়সী এই নারী একজন ফিলিস্তিন-আমেরিকান আইনজীবী যিনি মিশিগান থেকে এসেছেন, তার দাদি এবং অন্যান্য আত্মীয়-স্বজন পশ্চিম তীরে বসবাস করছেন।ইসরাল তার প্রবেশাধিকার প্রত্যাখ্যান করার পর, রাশিদা তালেব টুইটারে তার দাদির একটি ছবি পোস্ট করেন এবং সেখানে লেখেন, “তার নাতনিকে যিনি একজন মার্কিন কংগ্রেস সদস্য তাকে নিষেধাজ্ঞা দেয়ার ইসরাইলের সিদ্ধান্ত একটি দুর্বলতার লক্ষ্মণ কারণ প্রকৃত সত্য হচ্ছে ফিলিস্তিনে যা ঘটছে তা ভয়ানক”।

 

 

 

 

 

নাগরিক অধিকারের লড়াই:  রাশিদা তালেব একটি পোস্ট রি-টুইটও করেন যেখানে যে বিষয়টি উঠে আসে, দক্ষিণ আফ্রিকার অ্যাপার্থিড বা বর্ণবাদী সরকারের পক্ষ থেকে সুপরিচিত আফ্রিকান-আমেরিকান অধিকার কর্মী এবং রাজনীতিবিদ জেসি জ্যাকসনের প্রবেশাধিকার নাকচ করার বিষয়টি।

 

 

 

 

রাশিদা তালেবকে একজন এন্টি-সেমেটিক বা ইহুদি-বিদ্বেষী হিসেবে তার বিরুদ্ধে সমালোচনা করায় ইসরাইলকে একটি “বর্ণবাদী” দেশ হিসেবে অভিহিত করেন।এই বিতর্কে তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সহচর মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের কংগ্রেসওম্যান ইলহান ওমর, যিনি ৩৮ বছর বয়সী একজন সোমালি বংশোদ্ভূত আমেরিকান এবং হিজাব পরেন। ১৯৯৫ সালে একজন শিশু শরণার্থী হিসেবে আমেরিকায় প্রবেশ করেন ইলহান।তার নিজের এবং রাশিদা তালেবের ওপর ইসরাইলে ঢোকার বিষয়ে এই নিষেধাজ্ঞাকে তিনি দেখছেন “একটি অপমান” হিসেবে।

 

 

 

 

 

 

তিনি বলেন, এটা বিদ্রূপাত্মক যে ইসরাইল, যে দেশটি মধ্যপ্রাচ্যে নিজেকে “একমাত্র গণতান্ত্রিক” হিসেবে দাবি করে, তারাই এমন একটি সিদ্ধান্ত নিল যা কিনা “গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অপমান”।ইলহান ওমর কংগ্রেসে যোগ দেয়ার পর থেকেই ইসরাইল প্রসঙ্গে তার মতামত আলোচনা আসেন।

 

 

 

 

 

এই বছরের শুরুর দিকে, তিনি ইসরাইল-পন্থী লবি গ্রুপ আইপ্যাককে (দি আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি) ইঙ্গিত করে একটি পোস্ট টুইট করে লেখেন যে, তারা ইসরাইলপন্থী এজেন্ডা বাস্তবায়নে আর্থিক প্রণোদনা কাজে লাগাচ্ছিল।তার মন্তব্যকে ঘিরে তার সমর্থক এবং সমালোচকদের মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় বাকযুদ্ধ শুরু হয়ে যায় মার্কিন রাজনীতিতে আইপ্যাকের ভূমিকা নিয়ে ও ইলহান ওমর ইহুদিদের প্রতি বিদ্বেষী ছিলেন কি-না তা নিয়ে।

 

 

 

 

 

 

ইহুদি বিদ্বেষী অভিযোগ: তিনি পরে অবশ্য “দ্ব্যর্থহীণভাবে ক্ষমা” প্রার্থনা করে টুইট করেন, ইহুদি-বিদ্বেষী বেদনাদায়ক ইতিহাস সম্পর্কে তাকে অবহিত করার জন্য সহকর্মীদের প্রতি ধন্যবাদ জানান এবং বলেন যে, তার উদ্দেশ্য ছিল লবিস্টদের সমালোচনা করা, ইহুদিদের নয়।ইহুদি-বিদ্বেষী টুইট করার অভিযোগে তীব্র সমালোচনার তোপের মুখে পড়ে সোমালিয়-আমেরিকান এই রাজনীতিবিদের জন্য এটা ছিল দ্বিতীয়বারের মত ক্ষমা চাওয়ার ঘটনা।

 

 

 

 

কংগ্রেসে যোগ দেয়ার পর তার ২০১২ সালে করা একটি পোস্ট আবার সামনে চলে আসে যেখানে তিনি লিখেছিলেন, “ইসরাইল বিশ্বকে সম্মোহিত করে রেখেছে, আল্লাহ মানুষকে জাগ্রত করুন এবং তাদের সাহায্য করুন ইসরাইলের সমস্ত মন্দ-কাজ যেন তারা দেখতে পারে”।এই টুইটে গাযার বিরুদ্ধে ইসরাইলের অপারেশন পিলার অব ডিফেন্স অভিযানের সাথে মিলে যায় যে অভিযানে জাতিসঙ্ঘের হিসেবে ছয়জন ইসরাইলি এবং ১৫৮ জন ফিলিস্তিন মারা যায়।

 

 

 

 

 

এর মধ্যে ৩০ জন শিশু ১৩ জন নারী।এই দুজন নারী কংগ্রেস সদস্যের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং সরব সমালোচক হলেন স্বয়ং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি তাদের প্রবেশাধিকার নাকচ করার জন্য ইসরাইলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন।এই দুজন নারীকে তিনি “একটি কলঙ্ক” বলে আখ্যা দেন এবং বলেন, ” ইসরাইল যদি ওমর এবং তালেবকে সফরের অনুমোদন দেয় তাহলে তা হবে বিশাল দুর্বলতার প্রদর্শন”।টুইটারে ট্রাম্প লেখেন, “তারা ইসরায়েল এবং সকল ইহুদির ঘৃণা করে এবং তাদের মানসিকতা পরিবর্তনের জন্য কিছুই বলার বা করার নেই”।

 

 

 

 

 

 

বয়কট-বিরোধী আইন: ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, মার্কিন নারী কংগ্রেস সদস্য দুজনের সফর বাতিলের ক্ষেত্রে বয়কট বিরোধী আইনের ব্যবহার করা হয়েছে।২০১৭ সালে নেতানিয়াহু সরকারের পাশ করা এই আইনের অধীনে , কোনো বিদেশী ইসরাইলকে কেন্দ্র করে যে কোনো ধরনের বয়কটের আহবান জানালে -সেটা অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক কিংবা শিক্ষাগত- যেমনই হোক না কেন-তাহলে তার এন্ট্রি ভিসা নাকচ করা হবে।

 

 

 

 

 

 

ইসরাইলের অস্তিত্বের জন্য এই বয়কট মুভমেন্টকে একটি হুমকি হিসেবে অভিযোগ করে দেশটি, কংগ্রেসের উভয় শিবিরের মার্কিন রাজনীতিবিদরাও এই মতকে ব্যাপকভাবে ধারণ করেন।নারী কংগ্রেস সদস্য দুজনই ইসরাইল বয়কটের বা বর্জনের আহ্বানকে তাদের বিরুদ্ধে ‘ইহুদি-বিদ্বেষী’ হিসেবে দেখিয়ে যে অভিযোগ তোলা হচ্ছে তা নাকচ করেছেন।