প্রথমবার্তা প্রতিবেদক:  কোনও নেতার ক্যাডার বাহিনী থাকতে পারবে না বলে কড়া ভাষায় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।তিনি বলেছেন, আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ক্যাডার পলিটিক্সের কোনও স্থান নেই, যারা ক্যাডার পলিটিক্স করবেন এবং তাদের লালন-পালন করবেন তাদের বরদাস্ত করা হবে না।প্রধানমন্ত্রী বলেন, জঙ্গিবাদ যেভাবে দমন করেছি অস্ত্রবাজদেরও সেভাবেই দমন করা হবে। গত রাতে গণভবনে আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে তিনি এমন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।

 

 

 

 

বৈঠকে আগামী ২০ ও ২১ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় সম্মেলের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। সভায় আওয়ামী লীগ সভানেত্রী জানান, ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীকে অপসারণ করে প্রথম সহসভাপতি আল নাহিয়ান খান জয়কে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও প্রথম যুগ্মসাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে।

 

 

 

 

 

বৈঠকসূত্র জানান, ছাত্রলীগের দুই শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে মাদক সেবন, চাঁদাবাজিসহ বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রীর কাছে যায়। সেগুলো তদন্ত করে সত্যতা মেলে। এ ঘটনায় ব্যাপক বিরক্ত ছিলেন ছাত্রলীগের সাংগঠনিক নেত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল ছাত্রলীগের এ দুই শীর্ষ নেতাকে অপসারণ করে কেন্দ্রীয় নেতাদের ‘ক্ষমতার অপব্যবহার, অপকর্ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স’ নীতিতে অটল সেই বার্তা দিয়েছেন। বৈঠকে কথা প্রসঙ্গে ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতির আওয়ামী লীগে স্থান নেই জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কিছু কিছু ঘটনার জন্য আমার অর্জন যেন ব্যাহত না হয়।

 

 

 

 

 

আওয়ামী লীগে ক্যাডার পলিটিক্সের কোনো স্থান নেই। যারা ক্যাডার পলিটিক্স করছে এবং ক্যাডারদের মদদ দেবে তাদের স্থান আওয়ামী লীগে হবে না। যারাই দাম্ভিকতা দেখাবে, মানুষকে কষ্ট দেবে, সরকারের সুনাম নষ্ট করবে তাদের এক চুলও ছাড়া হবে না। অপরাধীকে আমি ছাড় দেব না। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের সবার সঙ্গে সহনশীল আচরণ করতে হবে। বিশাল বহর নিয়ে কোথাও যাওয়ার দরকার নেই। আপনাদের হোন্ডাবহরের কারণে মানুষ যেন কষ্ট না পায়। মানুষ যেন পেছন থেকে কোনো কথা না বলে। এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। যারা মানুষের কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়াবে আমি তাদের ছাড়ব না। বৈঠকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ছাড়াও ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, মাহবুব-উল আলম হানিফ, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আবদুর রহমানসহ আট সাংগঠনিক সম্পাদক তাদের রিপোর্ট পেশ করেন।

 

 

 

 

 

২০-২১ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের ২১তম সম্মেলন: বৈঠকে দলের ২১তম জাতীয় সম্মেলনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়। সভায় আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সূচনা বক্তব্যের পর রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে শোকপ্রস্তাব পাঠের পাশাপাশি আট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদকরা তাদের রিপোর্ট পেশ করেন। এ সময় দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা দ্রুততম সময়ের মধ্যে তৃণমূল সম্মেলনের তাগিদ দিয়ে বলেন, দ্রুততম সময়ের মধ্যে জেলা-উপজেলা সম্মেলন করতে হবে।

 

 

 

 

 

এ সময় কেন্দ্রীয় নেতারা বলেন, নেত্রী, আপনি সম্মেলনের সময় দিন, সব হয়ে যাবে। এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আগামী ২০-২১ ডিসেম্বর দলের ২১তম জাতীয় সম্মেলন হবে। আলোচনায় অংশ নিয়ে আওয়ামী লীগের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, নেত্রী, আমরা সম্মেলনে গিয়ে জেলা-উপজেলা নেতাদের কথা শুনি না। নিজেরা বক্তব্য দিয়েই চলে আসি।

 

 

 

 

এ সময় প্রধানমন্ত্রী নানককে থামিয়ে দিয়ে বলেন, তোমরা শুধু বক্তব্য দিয়েই চলে আসো না, খেয়েও আসো। এখন থেকে তৃণমূল নেতা-কর্মী ও জনপ্রতিনিধিদের কথা শুনবে। স্থানীয় নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের মতামতের ভিত্তিতে কমিটি গঠন করবে। এর আগে ২০১৬ সালের ২২-২৩ অক্টোবর আওয়ামী লীগের ২০তম জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

 

 

 

 

 

 

 

শেখ হাসিনা আহ্বায়ক-কাদের সদস্যসচিব: বৈঠকে আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় সম্মেলন প্রস্তুতি আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে। দলীয় সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আহ্বায়ক ও সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরকে সদস্যসচিব এবং কেন্দ্রীয় কমিটির সব নেতাকেই সদস্য করে জাতীয় সম্মেলন আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়।

 

 

 

 

 

আগামীতে কয়েকদিনের মধ্যেই আওয়ামী লীগের সম্পাদকম লীর বৈঠকে বিভিন্ন উপকমিটি গঠন করা হবে। বৈঠক শেষে ওবায়দুল কাদের সম্মেলন প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের বলেন, আগামী ২০-২১ ডিসেম্বর রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জাতীয় সম্মেলন করা হবে।

 

 

 

 

 

ছাত্রলীগ থেকে বাদ শোভন-রাব্বানী, দায়িত্বে জয়-লেখক: শুরু থেকেই বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের শিরোনামে ছিলেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। মাদক সেবন, চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজিসহ নানা কারণে গতকাল তাদের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের পরিবর্তে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে সংগঠনের প্রথম সহসভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন প্রথম যুগ্মসাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য।

 

 

 

 

 

বৈঠকে শেষে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীকে অব্যাহতি দিয়ে প্রথম সহসভাপতি আল নাহিয়ান খান জয়কে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও প্রথম যুগ্মসাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যকে সংগঠনের আগামী কাউন্সিল পর্যন্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের ১১ ও ১২ মে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। দুই মাস পর ৩১ জুলাই শোভন ও রাব্বানীকে যথাক্রমে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক করে কমিটি ঘোষণা করা হয়।

 

 

 

 

 

কেস-টু কেস ধরে ব্যবস্থা: স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যারা নৌকাবিরোধী হয়েছিলেন, তাদের এরই মধ্যে কারণ দর্শানো নোটিস দেওয়া হয়েছে। এদের বিরুদ্ধে কেস-টু কেস ধরে ব্যবস্থা গ্রহণের নিদের্শ দিয়ে দলীয় সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, নৌকাবিরোধীদের ক্ষমা নেই। প্রতিটি কেস-টু কেস ধরে জবাব নিতে হবে। শুধু জবাবই নয়, এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।

 

 

 

 

তৃণমূলকে ঢেলে সাজাতে হবে: বৈঠকের শুরুতেই সূচনা বক্তব্যে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে। দেশের অগ্রযাত্রা আর কেউ থামাতে পারবে না। নষ্ট করতে পারবে না। তবে আমাদের আরও অনেক দূর যেতে হবে, জাতির পিতার স্বপ্ন ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা গড়তে হবে, তাঁর স্বপ্ন পূরণ করতে হবে।

 

 

 

 

তৃণমূল পর্যন্ত সংগঠনকে (আওয়ামী লীগ) শক্তিশালী করে গড়ে তোলার নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি কথা মনে রাখতে হবে- আওয়ামী লীগ জাতির পিতার হাতে গড়া সংগঠন। কাজেই আমাদের দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। সেই কথা মাথায় রেখেই সংগঠনকে তৃণমূল পর্যায় থেকে সুসংগঠিত ও শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে হবে।

 

 

 

 

 

বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে। বাংলাদেশের এ অগ্রযাত্রা আর কেউ থামাতে পারবে না। আর আওয়ামী লীগের সম্মেলনটা যেন নিয়মিত হয়, সেজন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। দলের উপকমিটিগুলোকেও কাজ করতে হবে। দেশের জনগণের আস্থা-বিশ্বাস ধরে রাখতে দলের সকল পর্যায়ের নেতা-কর্মীকে সজাগ ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মাত্র এক দশকেই উন্নয়ন ও অগ্রগতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। এতে আওয়ামী লীগের প্রতি জনগণের আস্থা-বিশ্বাস বেড়েছে। কারণ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলেই দেশের মানুষ কিছু পায়, দেশের উন্নয়ন হয়। তাই জনগণের এ আস্থা ধরে রাখতে হবে, জনগণের আস্থায় যেন ফাটল না ধরে সেজন্য নেতা-কর্মীদের সজাগ থাকতে হবে।

 

 

 

 

 

তিনি বলেন, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগই একমাত্র রাজনৈতিক দল যার সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক নীতিমালা রয়েছে। শুধু সরকারে থাকতেই নয়, বিরোধী দলে থাকতেও অর্থনৈতিক নীতিমালা তৈরি করি, যাতে আগামীতে দেশ ও দেশের মানুষের জন্য কী কী করব, দেশকে কীভাবে এগিয়ে নিয়ে যাব। ক্ষমতায় এসে সেই পরিকল্পনা অনুযায়ীই দেশকে আমরা উন্নয়ন ও অগ্রগতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।

 

 

 

 

 

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সব দিক থেকে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ ও বর্তমান সরকারের প্রতি জনগণের একটা আস্থা-বিশ্বাসের সৃষ্টি হয়েছে। দেশের মানুষের এ আস্থা-বিশ্বাস ধরে রাখতে হবে। আন্তরিকতা নিয়ে জনগণের কল্যাণের জন্য নেতা-কর্মীদের কাজ করে যেতে হবে। তবেই আমরা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের উন্নত-সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গড়ে তুলতে পারব। চলতি মাসেই জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগদানের জন্য তাঁর যুক্তরাষ্ট্র সফরের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাকে জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগদানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যেতে হবে।

 

 

 

 

 

বেশ কয়েকদিন দেশে থাকতে পারব না। কিন্তু বাংলাদেশ এখন ডিজিটাল। দূরে থাকলেও এখন আর সেই দূর নেই। দূরে থাকলেও আমি আওয়ামী লীগ অফিসের কর্মকা দেখতে পারি, বিদেশে বসেই ই-ফাইলিংয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সরকারি কর্মকা সম্পন্ন করি। দেশের সবার হাতে হাতে এখন মোবাইল টেলিফোন। আমরা দেশকে ডিজিটালভাবেই গড়ে তুলেছি।

 

 

 

 

 

সন্ত্রাস-অগ্নিসন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ-মাদকের বিরুদ্ধে চলমান অভিযান অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, সন্ত্রাস, অগ্নিসন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ আমরা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছি। মাদকের বিরুদ্ধে যে অভিযান চলছে তা অব্যাহত থাকবে। এ ব্যাপারে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে।