প্রথমবার্তা, রিপোর্ট:  গভীর রাতে অনেকটাই নীরব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। নেই রাজনৈতিক আড্ডা। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যও নেই। অনেকটাই থমথমে পরিবেশ। গত ২৩ অক্টোবর রাতে আলো-আঁধারের মধ্যে হঠাৎ চোখে পড়ে কলাভবনের আশপাশে কয়েকজন তরুণ সন্দেহজনকভাবে ঘোরাঘুরি করছে। একসময় তারা তড়িঘড়ি করে বিভিন্ন দেয়ালে পোস্টার লাগাতে শুরু করে। এরপর দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ। এগিয়ে গিয়ে দেখা যায়, নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হিযবুত তাহ্রীরের পোস্টার। তাতে জঙ্গি মতবাদের পাশাপাশি সরকারবিরোধী নানা উসকানিমূলক বক্তব্য। বাংলাদেশের গণতন্ত্র, সংবিধান, আইন, শাসন ও বিচারব্যবস্থার বিরোধিতা।

 

 

 

 

জানা যায়, কিছুদিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনের বিরুদ্ধেও প্রচারে নেমেছিল তারা। সে সময় তাদের পোস্টার ক্যাম্পাসে যত্রতত্র চোখে পড়ত। তখন তারা সরকারবিরোধী মিছিল-মিটিংয়েও অংশ নেয়। এতে ক্ষোভ জানিয়ে ক্যাম্পাসের প্রগতিশীল সংগঠনগুলো দাবি করেছিল, গোয়েন্দা সংস্থা ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যর্থতায় জঙ্গিরা ক্যাম্পাসে ব্যাপকভাবে তৎপর হয়ে উঠছে। অবহেলা রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনেরও। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছিল, ‘হিযবুত জঙ্গিদের’ খুঁজে বের করা হবে।

 

 

 

 

 

কিন্তু নিষিদ্ধ হিযবুতের তৎপরতা বেড়েই চলেছে রাজধানীতে। তাদের তৎপরতায় সাম্প্রদায়িক উসকানি ছড়িয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কাও করছে অনেকে। এ নিয়ে অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিষিদ্ধ হওয়ার পরও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসসহ অন্যান্য এলাকায় জঙ্গিদের প্রকাশ্য উপস্থিতি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তাদের এই অপতৎপরতা যেকোনোভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

 

 

 

 

বিষয়টি সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক এ কে এম গোলাম রব্বানি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রক্টরিয়াল টিম শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তায় সব সময় সক্রিয় রয়েছে। সারা রাত প্রক্টরিয়াল টিম ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে টহল দেয়। এর পরও কখনো কখনো এসব সংগঠন সুযোগ নেয়। বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সঙ্গে যারা যুক্ত, তাদের কাছে আহ্বান, এ রকম কোনো বিষয় দেখলে সঙ্গে সঙ্গে আমাদের জানালে দ্রুত ব্যবস্থা নেব। এ ক্ষেত্রে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোরও সহযোগিতা নেওয়া হচ্ছে।’

 

 

 

 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মাঝেমধ্যেই রাত ২টা থেকে ফজরের আজান পর্যন্ত টিএসসি, মধুর ক্যান্টিনসহ ক্যাম্পাসের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান নেয় হিযবুত তাহ্রীরের সদস্যরা। এরপর সুযোগমতো দেয়ালে পোস্টার সাঁটায়। সেই সঙ্গে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে অনলাইনেও তারা লিফলেট, পোস্টারের ছবি ও লিংক অ্যাড্রেস পাঠায়। এর একটি লিংক কালের কণ্ঠ’র সংগ্রহে আছে। গত ১১ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রের কাছে পাঠানো মেসেজে বলা হয়েছে, ‘হে মুসলিমগণ, দেশের সকল স্বার্থকে বিসর্জন দিচ্ছে এই সরকার। এটাকে প্রতিহত করতে হবে।’ গত ৭ সেপ্টেম্বর আরেক ছাত্রের কাছে লিংকে লিখেছে, ‘ইসলাম, নবী-রাসুলের শত্রুদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান।’

 

 

 

 

 

একইভাবে হিযবুত তাহ্রীরের আমিরের বক্তব্যের ভিডিও লিংকও পাঠিয়ে উসকানি ছড়াচ্ছে তারা। ঢাকার রমনা, মতিঝিল, ধানমণ্ডি, গুলশান, বনানী, উত্তরাসহ বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দেয়ালে উসকানিমূলক পোস্টার সাঁটিয়ে চলছে তারা। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় গুলশান এলাকায় গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যে এক হিযবুত জঙ্গি দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে এক ব্যক্তির হাতে একটি লিফলেট ধরিয়ে দিয়ে সরে পড়ে। ওই সময় আশপাশে তার সঙ্গীদেরও দেখা যায়। তারাও একইভাবে লিফলেট বিতরণ করছিল। অদূরেই দুই পুলিশ সদস্য থাকলেও এমন অপতৎপরতা ঠেকাতে তাঁদের সক্রিয় হতে দেখা যায়নি। প্রকাশ্যে হিযবুত তাহ্রীরের পোস্টার বিতরণের বিষয়ে জানতে চাইলে এক পুলিশ সদস্য বলেন, ‘এটা আমাদের কাজ নয়, সাধারণত গোয়েন্দা বিভাগের সদস্যরা এদের নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।’

 

 

 

 

 

কিছুদূর এগিয়ে চোখে পড়ে জঙ্গিদের দেওয়া লিফলেট হাতে নিয়ে দেখছিলেন সেলিম নামের এক যুবক। তিনি বলেন, ‘পুরো পোস্টারেই সরকার, রাষ্ট্র, সংবিধানবিরোধী ধর্মীয় উসকানিমূলক তথ্য। নিষিদ্ধ সংগঠন কিভাবে এই পোস্টার বিলি করছে?’

 

 

 

 

 

জঙ্গিদের সাম্প্রতিক তৎপরতার খোঁজ নিতে গত শুক্রবারের জুমার নামাজের আগে বনশ্রীসহ মগবাজার ও বাড্ডা এলাকার কয়েকটি মসজিদের সামনে গিয়েও একই চিত্র চোখে পড়ে। একই ধরনের লিফলেট বিলি করছিল কয়েকজন তরুণ হিযবুত সদস্য। শুধু হিযবুতই নয়, নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিম, জেএমবিসহ অন্যান্য জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরাও গোপনে একইভাবে সমাজে ‘দাওয়াতি’ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে উগ্র-মৌলবাদের বীজ বপন করতে উসকানি ছড়াচ্ছে। পাশাপাশি ইন্টারনেটে বিশেষ অ্যাপস ব্যবহার করে একই ধরনের প্রচারণা চালাচ্ছে তারা। অবশ্য গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, হিযবুত তাহ্রীরের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডের ওপর বিশেষ নজর রাখছে র‌্যাব ও ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল (সিটিটিসি) ইউনিট।

 

 

 

 

 

জঙ্গিদের উসকানিমূলক তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে না আসার কারণ চাইলে সিটিটিসি ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘বিভিন্ন সময়ে আমরা হিযবুত তাহ্রীরের অনেক সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছি। এর পরও বিচ্ছিন্নভাবে তাদের কিছু তৎপরতা রয়েছে। উগ্রবাদ দমনে শুধু পুলিশই নয়, পরিবার, সিভিল সোসাইটিসহ সবার সম্মিলিত প্রয়াস থাকতে হবে।’

 

 

 

 

 

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, নিষিদ্ধ হিযবুত তাহ্রীরের সঙ্গে উচ্চশিক্ষিত অনেক তরুণ সংশ্লিষ্ট। তাদের বেশির ভাগ প্রযুক্তিতে দক্ষ। বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কয়েক শ হিযবুত সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে। তবে তারা জামিনে বেরিয়ে আবার একই কাজ করছে। এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ‘দেশে স্বাধীনতাবিরোধীরাই মদদ দিচ্ছে হিযবুতকে।’

 

 

 

 

 

নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ মেজর জেনারেল (অব.) এ কে মোহাম্মদ আলী শিকদার বলেন, ‘হিযবুতসহ নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে দেশ ও মানুষের অনেক ক্ষতি করবে তারা।’ধর্মভিত্তিক উগ্রপন্থী আন্তর্জাতিক সংগঠন হিযবুত তাহ্রীরের সব ধরনের কার্যক্রম ২০০৯ সালের ২২ অক্টোবর নিষিদ্ধ করে সরকার।