8 / 100 SEO Score

প্রথমবার্তা, রিপোর্ট:  সম্প্রতি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ও তাঁর সরকারের পদত্যাগের দাবিতে লাখো জনতার অংশগ্রহণে লংমার্চ অনুষ্ঠিত হয়েছে। লংমার্চ-পরবর্তী অভূতপূর্ব মহাসমাবেশ করে তুমুল আলোড়ন তুলেছেন মাওলানা ফজলুর রহমান। পাকিস্তানের জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম একাংশের প্রধান ও বিরোধীদলীয় নেতা মাওলানা ফজলুর রহমান পাকিস্তান ও মুসলিম বিশ্বের রাজনীতিতে এখন বেশ আলোচিত নাম।

 

 

 

 

জানা গেছে, মাওলানা ফজলুর রহমান জন্মসূত্রে ইসলামি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তাঁর পিতা মাওলানা মাহমুদ ছিলেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম পাকিস্তানের শীর্ষ নেতা ও বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ আলেম। মাওলানা ফজলুর রহমান ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দের ২১ জুন ঈদুল আজহার দিনে ডেরা ঈসমাইল খান জেলার আবদুল খয়ের গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার শুরুর দিকে স্কুলে পড়লেও মেট্রিকের পর মাদরাসায় এসেছেন এবং দারুল উলুম হক্কানিয়া আকুড়াখট মাদরাসা থেকে ১৯৭৯ খ্রিষ্টাব্দে দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করেন।

 

 

 

 

দাওরা ফারেগের পর প্রথম বছর শিক্ষকতা পেশায় একাগ্রচিত্তে নিয়োজিত থাকলেও ১৯৮০ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ অক্টোবর পিতা মাওলানা মাহমুদ যখন ইন্তেকাল করেন, ইন্তেকালের অব্যাবহিত পরপরই পিতার অসমাপ্ত মিশন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তিনি রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েন।

 

 

 

 

 

তিনি ১৯৮১ সালে পাকিস্তানের সেনাশাসক জিয়াউল হকের স্বৈরশাসনের প্রতিবাদে আন্দোলন করতে গিয়ে কারাবন্দী হন। তখন তিনি ২৭ বছরের টগবগে তরুণ। তিনি কারাবন্দী থাকাবস্থায়ই জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহাসচিব হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৯৯৫ খ্রিষ্টাব্দে আল্লামা আবদুল্লাহ দরখাস্তির ইন্তেকালের পর তিনি জমিয়তের প্রধান হিসেবে নিযুক্তি লাভ করেন।

 

 

 

 

সেই আশির দশক থেকে পাকিস্তানের জাতীয় রাজনীতিতে মাওলানা ফজলুর রহমান সক্রিয় ভূমিকা রেখে আসছেন। পরিচ্ছন্ন রাজনীতি এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য দশবারেরও অধিক কারাবরণ করেছেন। কিন্তু আভ্যন্তরীণ ও পশ্চিমা বিশ্বের নানা কূটচাল ও মোড়লিপনার কারণে ব্যাপক জনসমর্থন থাকা সত্ত্বেও তাঁকে ক্ষমতায় আসতে দেওয়া হয়নি। নানা সময় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছেন, ভোটকারচুপির মাধ্যমে তাঁকে পরাজিত করা হয়েছে কৌশলে।

 

 

 

 

 

১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দে বেনজির ভুট্টো দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসলে মাওলানা ফজলুর রহমান জাতীয় সংসদের পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির সভাপতি মনোনীত হন। আফগানিস্তানে তখন তালেবানের উত্থান ঘটেছে, মাওলানা ফজলুর রহমান তালেবানকে জোর সমর্থন জানান এবং দলটির মুখপাত্রের ভূমিকা পালন করেন। স্বাভাবিকভাবেই বহির্শক্তি তাঁর এ ভূমিকাকে ভালোভাবে নেয়নি। তাই তাঁর ওপর ডিজেল থেকে অংশীদারত্বের কল্পিত অভিযোগ আনা হয়। সমালোচনাকারীরা এই অজুহাতে তাঁকে ‘ডিজেল মাওলানা’ বলে ব্যাপক বিদ্রুপ করে। ৯৬ সালে বেনজির ভুট্টো ক্ষমতচ্যুত হয়ে নাওয়াজ শরিফ ক্ষমতায় আরোহন করেন। কিন্তু নওয়াজ সর্বশক্তি নিয়োগ করেও মাওলানার ওপর আরোপিত এই অভিযোগ সত্য প্রমাণ করতে পারেননি।

 

 

 

 

২০০২ সালে মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে ওঠে পাকিস্তানের সবকয়টি ইসলামি দলকে সঙ্গে নিয়ে মাওলানা ফজলুর রহমান ‘মুত্তাহিদা মজলিসে আমল’ বা এম এম এ নামে জোট গঠন করে নতুন এক শক্তি নিয়ে আবির্ভূত হন। কারচুপি সত্ত্বেও পরবর্তী নির্বাচনে ৭২টি আসন লাভ করেছিল এই জোট।

 

 

 

 

মাওলানা ফজলুর রহমান কেবলই যে একজন মাওলানা, এমন না, জাতীয় রাজনীতির দূরদর্শী এক ব্যক্তিত্বরূপেও পাকিস্তানে তিনি সুপরিচিত। জাতীয় রাজনীতির যেকোনো দুর্যোগকালে ক্ষমতাচ্যুত সকল নেতাই তাঁর দ্বারস্থ হন। মত ও সিদ্ধান্তে অনেকসময় ত্রুটি হতে পারে, কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা পাকিস্তানের রাজনীতিতে স্বীকৃত এবং অনন্য।

 

 

 

 

 

পাকিস্তানের বহুল আলোচিত ও খ্যাতিমান সাংবাদিক হামিদ মীর তাঁর বিভিন্ন লেখা ও বক্তৃতায় নির্দ্বিধায় স্বীকার করেন এই বিষয়টা। এক কলামে তিনি লেখেন, অসংখ্য যুবক আমাকে জিজ্ঞেস করেন যে, পাকিস্তানে সবচেয়ে ধীমান রাজনীতিবিদ কে? আমি সাধারণত এমন প্রশ্ন এড়িয়ে চলি। কিন্তু কিছু নাছোড়বান্দা যখন আমাকে সাপের ন্যায় প্যাঁচিয়ে ফেলে, তখন অনায়াসে তাদের জবাবে মুখ থেকে বেরিয়ে আসে, মাওলানা ফজলুর রহমান।

 

 

 

 

মজার কথা হলো, কেউ কেউ এ জবাব শুনে খুশিতে আত্মহারা হয়ে যান, আবার কেউ কেউ অগ্নির্শমা হয়ে বলে দেন যে, তাহলে তাকে ‘ডিজেল মাওলানা’ বলা হয় কেন? আমি সচরাচর এর জবাব এভাবে দিই যে, তাঁকে ডিজেল মাওলানা খেতাবদাতা জনাব আতাউল হক কাসেমী ও একথা অকপটে স্বীকার করতে বাধ্য যে, মাওলানা ফজলুর রহমান পাকিস্তানের ধীমান রাজনীতিবিদদের প্রথম সারির একজন।’

 

 

 

 

 

হামিদ মীর আরো লিখেন, আমার সাথে মাওলানা ফজলুর রহমানের বন্ধুত্ব অনেক পুরাতন। কিন্তু কোনো কোনো সময় আমার সাংবাদিকতার বেয়াদবী মাওলানাকে খেপিয়ে তুলে। আমাকে তার রাগের স্বাদও সাময়িকভাবে আস্বাদন করতে হয়। বয়সে বড় হবার পরও তিনি আমাকে শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখে থাকেন। মাওলানা ফজলুর রহমান তার র্বণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে প্রায় ১০০ শতাংশ সফল। তবুও তার পেছনে অনেকের কানাকানি ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতে যে থাকবে না তা বলা যায় না।

 

 

 

 

কিন্ত ধ্যার্থহীনভাবে বলতে হয়, তিনি মহান পিতার যোগ্য সন্তান। একটি মধ্যবিত্ত দীনদার ফ্যামেলিতে বেড়ে ওঠা মাওলানা নিজের দীনদারী থেকে একটুও পিছপা হননি। তিনি উলামায়ে দেওবন্দের স্বার্থক উত্তরসুরী, সীমান্ত প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী মুফতী মাহমুদ রাহ.-এর দ্বীনি ও রাজনৈতিক উত্তরসুরী। পিতা ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী আর পুত্র হলেন কেন্দ্রীয় সরকারের বিরোধীদলীয় প্রধান। যদি আমেরিকার কারসাজি না হত, তাহলে তিনি ২০০২ সালে হতেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী।

 

 

 

 

মাওলানা ফজলুর রহমানের স্মরণশক্তি ও দূরদর্শিতার পর্যালোচনা করতে গিয়ে পশ্চিমা গণমাধ্যম বিবিসি তার রির্পোটে বলেছে, মাওলানা একসাথে পাঁচটি কাজ সমাধা করতে পারদর্শী। ২০০৫ সালের এশিয়ান সার্ভে রিপোর্টে মাওলানাকে এশিয়ার ৫ম ও বিশ্বের ঊনিশতম ধীমান রাজনীতিবিদ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

 

 

 

 

 

মাওলানাকে ‘ডিজেল মাওলানা’ বলে বিদ্রুপকারী সাংবাদিক আতাউল হক কাসেমীও বলেন, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতায় মাওলানা ফজলুর রহমানের কোনো জুড়ি নেই। তিনি ডিপ্লোমেটিক ব্যবহারে দারাজ হাতের মালিক। আমার বিশ্বাস তিনি যদি কোনো ধর্মীয় নেতা না হতেন তাহলে গোটা পাকিস্তান তার পিছে পিছে দৌড়াতো। প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী হওয়া তার জন্য কোনো কঠিন কাজ ছিল না।