9 / 100 SEO Score

প্রথমবার্তা, রিপোর্ট:  দেশজুড়ে আওয়ামী লীগে ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করে যে তালিকা করা হয়েছে তা নিয়ে তালগোল বেঁধেছে দলটির তৃণমূলে। অনুপ্রবেশকারী বলতে আসলে কাদের বোঝানো হয়েছে, তা নিয়ে ধন্দে সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। কোন মাপকাঠিতে এই অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করা হয়েছে তা নিয়ে স্পষ্ট ধারণা নেই আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদেরও। এমনকি তাঁরা এখনো জানেন না, অনুপ্রবেশকারীদের তালিকায় স্থান পাওয়া নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

 

 

তালিকায় দেশের আট বিভাগের জেলাগুলোতে বিভিন্ন দল থেকে আওয়ামী লীগে আসা নেতাকর্মীদের নাম রয়েছে। তবে এ তালিকায় নেই অনেক গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রবেশকারী নেতার নাম। স্বাধীনতাবিরোধী পরিবারের সদস্য, ফ্রিডম পার্টির সাবেক নেতা ছিলেন এমন অনেকের নাম নেই তালিকায়। আবার আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত নন, এমন ব্যক্তির নামও রয়েছে তালিকায়। অসম্পূর্ণ এবং ভুল তথ্যও রয়েছে তালিকায়। ফলে এ তালিকা নিয়ে রাখঢাক করছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারাও। আট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা এ তালিকার বিষয়ে তথ্য জানাতে চাইছেন না।

 

 

 

 

অনুপ্রবেশকারীদের তালিকা প্রকাশের পর বিব্রত দু-তিন দশক আগে বিভিন্ন দল থেকে আওয়ামী লীগে আসা অনেক নেতা। অনুপ্রবেশকারীদের তালিকা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ না করায় তাঁরা তৃণমূল পর্যায়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কটাক্ষের শিকার হচ্ছেন। দলীয় প্রতিপক্ষরাও এ সুযোগে তাঁদের নানাভাবে নাজেহালের চেষ্টা করছে।

 

 

 

 

 

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা প্রথমবার্তাকে বলেছেন, তালিকাটিতে অনুপ্রবেশকারী হিসেবে যাঁদের চিহ্নিত করা হয়েছে তাঁদের বেশির ভাগই বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী। কিন্তু বিএনপির যাঁরা অপকর্মে বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন না তাঁদের আওয়ামী লীগে ভেড়ালে বরং লাভই হবে। যাঁরা যুদ্ধাপরাধী জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে যুক্ত, কিংবা বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দল ফ্রিডম পার্টিতে যুক্ত ছিলেন তাঁদের আওয়ামী লীগে যোগদানের বিষয়টি কঠোরভাবে বন্ধ করে অন্যদের জন্য দরজা খুলে রাখাই বরং ভালো হবে।

 

 

 

 

 

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ড. আব্দুর রাজ্জাক প্রথমবার্তাকে বলেন, ‘বিএনপি থেকে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির যেসব নেতাকর্মী আওয়ামী লীগে আসতে চায় তাদের জন্য দরজা বন্ধ রাখলে তো বিএনপিকে দুর্বল করা যাবে না। তবে খেয়াল রাখতে হবে, তারা যেন আওয়ামী লীগে গুরুত্বপূর্ণ কোনো পদ না পায়।’তালিকাভুক্ত অনুপ্রবেশকারীরা সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারবেন কি না জানতে চাইলে আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘এটা তাদের অপরাধের মাত্রা বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

 

 

 

 

 

 

অনুপ্রবেশকারীরা আওয়ামী লীগে যুক্ত থাকতে পারবেন কি না বা তাঁদের বিরুদ্ধে কী ধরনের সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্যাহ ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক কালের কণ্ঠকে জানান, বিষয়টি এখনো স্পষ্ট হয়নি। শিগগিরই এ বিষয়টি নিয়ে অস্পষ্টতা দূর করা হবে।

 

 

 

 

 

আওয়ামী লীগের একজন সাংগঠনিক সম্পাদক নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথমবার্তাকে বলেন, “তালিকা নিয়ে আমরা দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা মহা ঝামেলায় আছি। কেউ বলছেন, ‘ভাই, আমি তো অমুক এমপির সঙ্গে কথা বলে অনুষ্ঠান করে যোগ দিলাম, বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ পদ ছাড়লাম, এখন আপনারা বানালেন অনুপ্রবেশকারী।’ আবার কেউ কেউ ফোন করে বলছেন, ‘ভাই, অমুককে বাদ দিয়ে কিভাবে তালিকা হয়?’”

 

 

 

 

 

 

অনুপ্রবেশকারীদের তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দিনাজপুর জেলার তালিকায় ২৬ নম্বরে বীরগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলামের নাম রয়েছে। তিনি বিএনপির নেতা ছিলেন এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা আওয়ামী লীগের সমর্থক বলে তালিকায় উল্লেখ রয়েছে।খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০০৪ সালের আগ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ করলেও পরে তিনি বিএনপি ও এরপর এলডিপিতে যোগ দেন। পরে আবার আওয়ামী লীগে ফিরে নৌকা প্রতীক নিয়ে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হয়েছেন।

 

 

 

 

 

বীরগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যানের নাম থাকলেও তালিকায় নেই স্থানীয় সংসদ সদস্য মনোরঞ্জন শীল গোপালের নাম। অথচ বর্তমান বীরগঞ্জ আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই একসময়ের জাগপা নেতা গোপালের অনুসারীদের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।ঠাকুরগাঁওয়ের রুহিয়া থানা আওয়ামী লীগের সদস্য নাসিরুল হকের নাম আছে অনুপ্রবেশকারীর তালিকায়। তালিকায় মন্তব্যের ঘরে লেখা আছে নাসিরুলের বাবা-চাচা আওয়ামী লীগের সমর্থক এবং এক চাচা ঠাকুরগাঁও জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি।

 

 

 

 

 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নাসিরুলের নামে বিএনপি-জামায়াতের তাণ্ডবের সময় কোনো নাশকতার মামলা হয়নি। তিনি ছাত্রজীবনে রুহিয়া ডিগ্রি কলেজের ছাত্রসংসদে ছাত্রলীগের প্যানেল থেকে ভিপি ও জিএস পদে নির্বাচন করেছেন। পরে স্থানীয় রাজনীতিতে অভ্যন্তরীণ কোন্দলে একসময় বিএনপিতে যোগ দেন। ২০১৩ সালের দিকে আবারও আওয়ামী লীগে ফেরেন।

 

 

 

 

 

নাসিরুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা অনুপ্রবেশকারী নই। আমরা পুরনো আওয়ামী লীগার। আমাদের যারা অনুপ্রবেশকারী বলে তারাই অনুপ্রবেশকারী। স্থানীয় গ্রুপিংয়ের কারণে একসময় রাগের মাথায় বিএনপিতে গিয়েছিলাম; কিন্তু পরে ফিরে আসি।’

 

 

 

 

 

দিনাজপুর জেলার তালিকায় ১১২ নম্বরে রয়েছে হাকিমপুর উপজেলার আলী হাট ইউনিয়নের ইটাই গ্রামের আনিসুর রহমানের নাম। তালিকায় তাঁর আগের দলীয় পরিচয় লেখা রয়েছে শিবিরকর্মী, আর বর্তমানে আওয়ামী লীগের কর্মী। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আনিসুরের বাবা আজিবর আলী হাট ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সদস্য। কিন্তু আনিসুর আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত নন। ৮ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল ইসলাম প্রথমবার্তাকে বলেন, ‘আনিসুরের বাবা দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ করেন। কিন্তু আনিসুর আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত নন।’

 

 

 

 

 

দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সদস্য আকিল আহম্মেদ বছর তিনেক আগে স্থানীয় সংসদ সদস্য খালিদ মাহমুদ চৌধুরীর উন্নয়ন কর্মকাণ্ড দেখে উৎসাহিত হয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ধান ও চাল ব্যবসায়ী আকিল বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত থাকলেও নাশকতা বা সহিংস কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন না। তিনিসহ আরো বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। তবে তাঁরা দলটিতে কোনো পদ পাননি। দিনাজপুর জেলার তালিকায় আকিলসহ ৯১ থেকে ৯৬ নম্বর পর্যন্ত প্রত্যেকের মুক্তিযুদ্ধে পরিবারের ভূমিকার ঘরে লেখা হয়েছে—‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে।’

 

 

 

 

 

দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলা পরিষদের দুবারের চেয়ারম্যান ছিলেন সাবেক বিএনপি নেতা ফরহাদ হাসান চৌধুরী ইগলু। ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। বর্তমানে উপজেলা আওয়ামী লীগের এ সদস্যের নামও আছে অনুপ্রবেশের তালিকায়। মন্তব্যের ঘরে লেখা আছে—‘বাবা, দাদা, চাচা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিলেন।’ ইগলুর বিরুদ্ধে কোনো মামলা থাকার তথ্যও পাওয়া যায়নি।

 

 

 

 

একই থানা বিএনপির সহসভাপতি খায়রুল আলম বাদশাও প্রায় ৯ বছর আগে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অপকর্মে যুক্ত থাকার তথ্য না থাকলেও তিনি অনুপ্রবেশকারীদের তালিকায় রয়েছেন। খায়রুল আলম বাদশা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘স্থানীয় সংসদ সদস্যের সঙ্গে আলাপ করে আমরা বিএনপি থেকে পদত্যাগ করি। তিনি আমাদের আশ্বাস দিয়েছিলেন উপজেলা কমিটিতে ভালো পদ দেবেন। এক বছর পরে আমরা উপজেলা কমিটির সদস্য হই। আমরা এটা নিয়েই সন্তুষ্ট। আমি মনে করি, সন্ত্রাস বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত না থাকলে অন্য দলের হলেও তাঁদের আওয়ামী লীগে স্থান দেওয়া উচিত। একটা মানুষের উপলব্ধি ও রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন হতেই পারে।’

 

 

 

 

 

 

তালিকায় ফ্রিডম পার্টি ও স্বাধীনতাবিরোধীদের পরিবারের সদস্যদের নাম রাখা হয়নি। ২০১৯ সালের ২৪ মার্চ খুলনায় বিএনপিপন্থী ১২ জন কাউন্সিলর আওয়ামী লীগে যোগ দেন। তাঁদের মধ্যে আটজন সাবেক ও বর্তমান বিএনপির নেতা, বাকি চারজন স্বতন্ত্র হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়া কাউন্সিলরা হলেন ২ নম্বর ওয়ার্ডের মো. সাইফুল ইসলাম, ৬ নম্বর ওয়ার্ডের শেখ শামসুদ্দিন আহমেদ, ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সুলতান মাহমুদ, ৮ নম্বর ওয়ার্ডের এইচ এম ডালিম, ১২ নম্বর ওয়ার্ডের মনিরুজ্জামান, ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের আনিসুর রহমান বিশ্বাস, ১৭ নম্বর ওয়ার্ডে শেখ হাফিজুর রহমান, ২০ নম্বর ওয়ার্ডের শেখ মো. গাউসুল আজম।

 

 

 

 

 

 

বিএনপি নেতাদের মধ্যে শেখ হাফিজুর রহমান, আনিছুর রহমান বিশ্বাস বহিষ্কৃত ছিলেন। তাঁরা দুজন খুলনার বিখ্যাত বিশ্বাস বাড়ির সদস্য। খান এ সবুরের বিশ্বাসভাজন ও রাজাকার পরিবার বলে বিশ্বাস বাড়িটি পরিচিত। পরিবারটি যার নামে পরিচিত সেই টুকু বিশ্বাস একাত্তরে রাজাকার ছিলেন এবং স্বাধীনতার পর এর দায়ে কারাগারে ছিলেন।

 

 

 

 

শেখ গাউসুল আজম নিজে বিএনপি থেকে পদত্যাগ করলেও পরে বিএনপির মনোনয়ন নিয়েই কাউন্সিলর পদে বিজয়ী হন। বাকিরা নগর ও থানা বিএনপির বিভিন্ন পদে রয়েছেন। এ ছাড়া স্বতন্ত্র বলে পরিচিত চার কাউন্সিলর হলেন ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের ইমাম হাসান চৌধুরী, ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের গোলাম মওলা শানু, ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর শেখ আরিফুল ইসলাম এবং সংরক্ষিত ১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মনিরা আকতার। তাঁদের মধ্যে কাউন্সিলর শানু ফ্রিডম পার্টির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অথচ তাঁদের নাম নেই অনুপ্রবেশকারীদের তালিকায়।

 

 

 

 

 

 

জানতে চাইলে, সিরাজগঞ্জ সদর আওয়ামী লীগের একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথমবার্তাকে বলেন, ‘অনুপ্রবেশকারীদের তালিকা হওয়ার পর থেকে আমরা যারা কয়েক দশক আগে বাম রাজনীতি ছেড়ে আওয়ামী লীগে এসেছি তাঁদের ঘায়েল করার জন্য নানা চেষ্টা চলছে। আবার অনেকে আমাদের কটাক্ষ করছে। অথচ আমরা যখন আওয়ামী লীগে এসেছি তখন ছিল দলের দুর্দিন।’