প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক: এক অদ্ভুত কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি আমরা। গোটা বিশ্ব। এ রকম সময় আমি আমার জীবদ্দশায় দেখিনি। আমার মা-শাশুড়ি মা, সকলের মুখেই এক কথা। এই মহামারী ভারতে সত্যি তো আগে হয়নি!

 

 

 

 

জানুয়ারিতে প্রথম শুনেছিলাম করোনাভাইরাসের কথা। খুব একটা পাত্তা দিইনি। ভেবেছিলাম ডিজিটাল দুনিয়ায় যেমন ফেক নিউজ ঘুরে বেড়ায় সে রকম কিছু হবে। সময় বদলালো, ধীরে ধীরে করোনা গ্রাস করতে লাগল, ছড়াতে লাগল গোটা বিশ্বে।

 

 

 

ভারতে দেখলাম সংখ্যাগুলো বাড়ছে। ভয় করতে লাগল। আমাদের ‘ধর্মযুদ্ধ’-র সব প্রমোশন একে একে ক্যান্সেল হল। আসতে আসতে ভাইরাস আমাদের সমাজকে, মনকে গ্রাস করতে শুরু করল।

 

 

 

 

ঠিক এ রকম সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ঘোষণা করলেন ‘জনতা কার্ফু’। এমারজেন্সি সার্ভিস ছাড়া রবিবার কেউ বাড়ি থেকে যেন না বেরয়। আর ঠিক বিকেল ৫টায় নিজের বারান্দায়, ছাদে দাঁড়িয়ে আমরা দেশের সব মানুষ যেন হাততালি দিই, থালা, ঘটি বাজিয়ে ডাক্তার-সহ বাকি এমারজেন্সি কর্মীদের কাজের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। কারণ তারা নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ২৪ ঘণ্টা কোভিড ১৯-এর বিরুদ্ধে লড়াই করছেন। আমার খুব ভালো লেগেছে বিষয়টা। খুব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত।

 

 

 

 

 

 

রবিবার সকাল থেকে খবরেও দেখলাম সত্যি সবাই ‘জনতা কার্ফু’ পালন করছে। রাস্তা ফাঁকা। একটা-দু’টো গাড়ি চলছে। আমি বার বার রাজকে জিগ্যেস করছিলাম আমরা তো ক্ল্যাপ করব? সবাই করবে? একটা সন্দেহ ছিল আমার। কিন্তু রাজ বার বার বলল, ‘দেখো, সবাই করবে।’ ঠিক তাই। পাঁচটায় আমাদের কমপ্লেক্সের সব ব্যালকনি ভরে গেল। একসঙ্গে এত মানুষ আগে দেখিনি।

 

 

 

উলুধ্বনি, শঙ্খের ধ্বনি, হাতের তালি, থালা বাটি, সব একসঙ্গে বেজে উঠেছিল সে দিন। গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠেছিল আমার। বুকটা ভারী ভারী লাগছিল। চোখ দিয়ে কখন যে জল গড়িয়ে গিয়েছিল বুঝতে পারিনি! জোরে জোরে আমি আর রাজ গান গাইতে শুরু করলাম, ‘উই শ্যাল ওভারকাম’।

 

 

 

 

হাতের তালি আরও জোরে জোরে বেড়ে গেল। ভাবছিলাম তখন, সারা ভারতের মানুষ আমরা এক! কোথায় গেল তারা যারা কিছু দিন আগেই নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করছিল? কে বেশি শক্তিশালী সেটা প্রমাণ করার চেষ্টা করছিল? মারামারি, খুনোখুনি, আর ঠিক সেই সময়ে এমন একটা রোগের আবির্ভাব হল যা আমাদের সকলকে এক করে দিল। ‘জনতা কার্ফু’ সফল হল।

 

 

 

 

তার পর ২১ দিনের লকডাউনের সিদ্ধান্ত এল। মনখারাপের শুরু। দিনমজুরদের কী হবে? যে মানুষগুলো না বুঝেই রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছিল থালা-বাটি নিয়ে তারা মানবে তো লকডাউন? সকলে কোভিড ১৯-এর গুরুত্ব বুঝবে তো?

 

 

 

 

এই ভেবেই সারা দিন কাটল। যে ভাবে আমাদের বাংলার দিদি কঠিন পরিশ্রম করে, নিজের কথা না ভেবে, সকলের মা হয়ে উঠেছেন, সেই মায়ের কথা সবাই বুঝছেন তো? ভেবেই চলেছি। যেন আর কোনও ভাবনাই নেই। লাঞ্চ করে ঘুমিয়ে পড়লাম। ভাবলাম এত ভাবছি! ঘুমের মধ্যে যদি এই চিন্তা দূর হয়…

 

 

 

 

ঘুম ভেঙেও মন কেমন। জানলায় এসে দাঁড়ালাম। পরদা সরাতেই চমকে উঠলাম। সূর্যটা টকটকে লাল হয়ে পশ্চিমে পাড়ি দিচ্ছে। ওই তেজ দেখে মনের সব কালো, দুশ্চিন্তা দূর হল। মনে হল, খারাপ সময় আমাদের অনেক কিছু শেখায়। তাই হয়তো বলে, সব খারাপের আড়ালে ভালর আলো লুকিয়ে থাকে। সূর্য অস্ত গেল…

 

 

 

 

মনে হল শেষ কবে এমন সূর্য ডোবা দেখেছি? সেই ছোটবেলায় বর্ধমানে ছাদে বসে ভাইবোনেরা মিলে আচার খেতে খেতে সূর্য অস্ত যাওয়া দেখতাম। কত কিছু মনে পড়ে গেল…

 

 

 

বিস্ময়, প্রশ্ন… এত দিন টানা পরিবারের সঙ্গে কবেই বা সময় কাটিয়েছি? নাহ্, মনেই পড়ছে না। একটানা নিজের সঙ্গে কথা বলা… এখন কেমন বলে চলেছি। নিজের ভেতর যেমন দেখতে পাই, হাতড়াই… কথা বলি। ভাবলাম, করোনার সঙ্গে আমরা সকলে তো লড়বই, তার সঙ্গে আমার এই পজিটিভ অনুভূতি সকলের সঙ্গে শেয়ার করব। প্রচার শুরু করলাম, মানুষ যেন বাড়ি থেকে না বেরোয়। এই রোগের গুরুত্ব নিয়েও প্রচার করলাম।

 

 

 

লকডাউনে গল্পের বই পড়ছি। সূর্যাস্ত দেখে এতটাই উজ্জীবিত হলাম, বেছে নিলাম রবীন্দ্রনাথ। ছোটগল্প। ‘পোস্টমাস্টার’, ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’, ‘কাবুলিওয়ালা’, ‘তোতাকাহিনী’। আরও চলবে…।

 

 

 

 

এক দিন হঠাৎ আমার পাশের ঘর থেকে আমার শ্বশুরের গান শুনতে পেলাম। গিয়ে দেখি, মায়ের দিকে তাকিয়ে বাবা গান গাইছেন, ‘তুমি যে আমার ওগো তুমি যে আমার’… উফ্! কি রোম্যান্টিক। হবে না-ই বা কেন? এখন করোনার জন্য তো টেলিভিশনে ধারাবাহিক বন্ধ। সব পুরনো গান চলছে সকাল থেকে। তাই এত বছর পরে মা আর আমার প্রাপ্তি হল বাবার গলায়, ‘তুমি যে আমার…’। এই প্রথম বার আমি, আমার বাবা আর মা এক জায়গায় অনেক দিন। আমার চঞ্চল বাবাকে মা সামলাতে পারছিল না। আমি বকেঝকে বাড়িতে বসিয়ে রেখেছি।

 

 

 

 

শুধু কি বাবা? আমার চঞ্চল বর! উফ্ফ্! কি পারফরম্যান্স! ও যে ভাবে বাড়িতে লক্ষ্মী হয়ে বসে আছে ভাবা যায় না। এমন পজিটিভ, অনুভূতিপ্রবণ, সংবেদনশীল মানুষ দেখে মুগ্ধ হয়ে যাই। কী পাল্টে গেল রে বাবা! সারাক্ষণ আমায় উৎসাহ দেয়। সারা দিন নেটফ্লিক্স আর অ্যামাজন প্রাইম দেখছে। সব দেখাই শেষ বোধ হয়। আর নিজের ছবির কনটেন্ট নিয়ে মাঝে মাঝে লেখালেখি করছে। কখনো দেখছি নতুন জিনিসও করছে। যেমন রান্না করছে আজকাল। আসলে ও খুব ‘প্রোডাক্টিভ ম্যান’।

 

 

 

 

 

এই কয়েক দিন নিজের পরিবারের সঙ্গে আড্ডা, একসঙ্গে খাওয়া, মাঝে মাঝে গান— এ ভাবেই চলছে। তবে যে যেখানেই থাকি খারাপটাকে ভাল করে নিতে পারি আমরা। পারব আমরা। এখন তাই শুধু সরকারের কথামতো চলি। লড়ব করোনার বিরুদ্ধে। সম্ভব হলে কিছু মানুষকে সাহায্য করব। আমরা জিতবই।