প্রথমবার্তা, প্রতিবেদকঃ বছর ঘুরে আবারও এলো মাহে রমজান। এ মাসে রাসুলুল্লাহ (সা.) অন্যান্য সময়ের চেয়ে বেশি ইবাদত-বন্দেগিতে মশগুল হতেন। এমনকি এক-দুই মাস আগে থেকেই নবীজি (সা.) রমজানের প্রস্তুতি শুরু করতেন। রমজান পর্যন্ত পৌঁছার দোয়া করতেন। আর রমজান শুরু হলে দীর্ঘ এক মাসের তারাবি, তাহাজ্জুদ, কোরআন তিলাওয়াত ও অন্যান্য নেক আমলের মধ্য দিয়ে কাটাতেন পবিত্র এই মাসটি। তাই মুসলিম উম্মাহর কাছে এই মাস আলাদা মহিমা ও তাৎপর্য নিয়ে আগমন করে।

 

 

পবিত্র এই মাহে রমজানে নবীজি (সা.) যেসব আমল করতেন নিম্নে তার কয়েকটি আমল উল্লেখ করছি :

সাহরি ও ইফতার
রমজানজুড়ে প্রিয় নবীজির আমল ছিল যথাসময়ে ইফতার করা। ঘরে, সফরে বা যুদ্ধক্ষেত্রে সব সময় নবীজির আমল ছিল সময় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খেজুর বা অন্য কোনো খাবারের মাধ্যমে রোজা ভাঙা।

 

 

একবারের ঘটনা, সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনু আওফ (রা.) বলেন, রমজান মাসে কোনো এক সফরে আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গী ছিলাম। সূর্য ডুবে গেলে তিনি বললেন, হে অমুক! অবতরণ করো এবং আমাদের জন্য ছাতু গুলে আনো। সে বলল, ইয়া রাসুলাল্লাহ! এখনো দিন রয়ে গেছে। পুনরায় তিনি বললেন, অবতরণ করো এবং আমাদের জন্য ছাতু গুলে আনো। তখন সে অবতরণ করল এবং ছাতুগুলো তাঁর নিকট পেশ করল। নবী (সা.) পান করলেন এবং হাত দ্বারা ইঙ্গিত করে বললেন, সূর্য এদিক থেকে অদৃশ্য হয়ে যায় এবং রাত যখন এদিক থেকে ঘনিয়ে আসবে, তখন সিয়াম পালনকারী ইফতার করবে। (মুসলিম, হাদিস : ২৪৪৯)

 

তবে সাহরির আমল ছিল ভিন্ন। নবীজি সাহরি খেতেন সুবহে সাদিকের আগে রাতের শেষ ভাগে। আর এই সময় সাহরি খাওয়া নবীজির পছন্দনীয় আমল। বিখ্যাত সাহাবি জায়দ বিন সাবিত (রা.) বলেন, আমরা আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে সাহরি খাই, এরপর তিনি সালাতের জন্য দাঁড়ান। বর্ণনাকারী বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, ফজরের আজান ও সাহরির মাঝে কতটুকু ব্যবধান ছিল? তিনি বললেন, পঞ্চাশ আয়াত (পাঠ করা) পরিমাণ। (বুখারি, হাদিস : ১৯২১)

 

 

তবে খেয়াল রাখতে হবে, বিলম্ব করতে গিয়ে যেন সাহরির সময় পার না হয়ে যায়।

তাহাজ্জুদ
রমজানে নবীজির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আমল ছিল তাহাজ্জুদের নামাজ। প্রথম রাতে তারাবি শেষ করে রাতের শেষ অংশে আবার তাহাজ্জুদের জন্য দাঁড়িয়ে যেতেন। প্রিয় নবীর তাহাজ্জুদ নামাজের সৌন্দর্য বর্ণনা করতে গিয়ে আম্মাজান আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) রমজান মাসে ও অন্যান্য সব মাসের রাতে এগারো রাকাতের অধিক সালাত আদায় করতেন না। প্রথমে চার রাকাত পড়তেন। এ চার রাকাত আদায়ের সৌন্দর্য ও দীর্ঘতা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করো না। অতঃপর আরো চার রাকাত সালাত আদায় করতেন। এ চার রাকাতের সৌন্দর্য ও দীর্ঘতা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করো না। অতঃপর তিন রাকাত আদায় করতেন। তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আপনি কি বিতির সালাত আদায়ের পূর্বে ঘুমিয়ে পড়েন? নবী (সা.) বললেন, আমার চোখ ঘুমায়, আমার অন্তর ঘুমায় না। (বুখারি, হাদিস : ৩৫৬৯)

 

 

কোরআন তিলাওয়াত ও দানশীলতা
রমজান মাস এলেই নবীজি কোরআন তিলাওয়াত ও সদকা—এই দুটি আমলের ওপর খুব বেশি গুরুত্ব দিতেন এবং সাহাবায়ে কেরামদেরও এর ওপর তাগিদ দিতেন। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, আল্লাহর রাসুল (সা.) ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ দানশীল। রমজানে তিনি আরো অধিক দানশীল হতেন, যখন জিবরাইল (আ.) তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন। আর রমজানের প্রতি রাতেই জিবরাইল (আ.) তাঁর সঙ্গে দেখা করতেন এবং তাঁরা একে অপরকে কোরআন তিলাওয়াত করে শোনাতেন। নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসুল (সা.) রহমতের বায়ু অপেক্ষাও অধিক দানশীল ছিলেন। (বুখারি, হাদিস : ৬)

 

 

ইতিকাফ
রমজানে নবী কারিম (সা.)-এর ধারাবাহিক ও গুরুত্বপূর্ণ আমল ছিল ইতিকাফ। আম্মাজান আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রমজানের শেষ দশকে নবী (সা.) ইতিকাফ করতেন। (বুখারি, হাদিস : ২০৩৩)

 

 

এমনকি জিহাদের সফরের কারণে এক রমজানে তিনি ইতিকাফ করতে পারেননি, তবে পরবর্তী বছর ২০ দিন ইতিকাফ করে তা পূর্ণ করে নিয়েছেন। এই মর্মে সাহাবি আবু হুরায়রা (রা.) বলেছেন, নবী কারিম (সা.) প্রতি রমজানে দশ দিনের ইতিকাফ করতেন। যে বছর তিনি ইন্তেকাল করেন সে বছর তিনি বিশ দিনের ইতিকাফ করেছিলেন। (বুখারি, হাদিস : ২০৪৪)

 

 

তাই আসুন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর সাহাবাদের পথ অনুসরণ করে পাপ-পঙ্কিলতা পরিহার করে তাকওয়া ও ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে এই মাসের রহমত, বরকত ও মাগফিরাত অর্জন করি।