প্রথমবার্তা, প্রতিবেদকঃ বৃহস্পতিবার

দুপুরবেলা আশ্রমের ম্যানেজার আমাকে ফোন দিলেন। সোজাসুজি বললেন আসল কথা। মায়ের শরীরে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়েছে। আশার কথা, তার মধ্যে জটিল কোনো লক্ষণ নেই। জ্বর কমে গেছে। কাশি থাকলেও শ্বাসকষ্ট নেই। সেবার জন্য আলাদা করে স্বাস্থ্যকর্মী আনা হয়েছে। এসব শুনে দুশ্চিন্তা একটু কমল।

 

 

শুক্রবার

দুপুরে আশ্রম থেকে আরেকজন ফোন দিলেন। অন্যদের সঙ্গে মাকেও হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে। ডাক্তার-নার্সদের এটাই পরামর্শ। যাতে তারা আরো ভালোভাবে সেবা করতে পারেন। ঘটনাটা খবরে প্রচারের পর আত্মীয়-স্বজনরা ফোন দিতে শুরু করল। এ সময়ের অনুভূতিটা খুবই অদ্ভুত।

 

 

শনি-রবি-সোমবার

অবস্থা অপরিবর্তিত। হাসপাতাল থেকে বলে দিল, আপাতত মার সঙ্গে কথা না বলাই ভালো।

 

 

মঙ্গলবার

পরিবার থেকে কেবল নির্দিষ্ট একজন মায়ের সঙ্গে দেখা করতে পারবে। সবার সঙ্গে আলাপ করে আমার নামই দিলাম। বাড়ির বাজার-সদাই সবই আমি করছিলাম। মাঝে একবার সর্দি-কাশিও হয়েছিল। হেলথলাইনে যোগাযোগের পর আমার পরীক্ষাও করানো হয়। একদিন পর ফলাফল আসে। নেগেটিভ।

 

 

গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পরলাম। মাঝে সুপারমার্কেটে থামলাম। মায়ের পছন্দের কিছু খাবার কিনলাম। তারপর সোজা হাসপাতালে। প্রবেশপথে নিরাপত্তাকর্মীর সঙ্গে একজন অফিস সহকারীও বসা। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ সেরে তিনি আমার হাতে একটা সাদা রিস্টব্যান্ড পরিয়ে দিলেন। হাসপাতালে প্রবেশ করে প্রথমেই হাত ধুলাম। ফরম পূরণ করলাম। তারপর সোজা চলে এলাম মায়ের ওয়ার্ডে।

 

 

দায়িত্বরত ডাক্তার মায়ের অবস্থা সম্পর্কে জানালেন। দুপুরে যেমনটা বলেছিলেন এখন অবস্থা তার চেয়ে অনেক খারাপ। নাকে নল বসিয়ে কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মায়ের অবস্থা কতটা গুরুতর তা এবার অনুধাবন করতে শুরু করলাম!

 

 

দেখা করার জন্য আমাকে পিপিই পরতে হলো। কিভাবে পরতে হবে তা ভালো করে শিখিয়ে দেওয়া হলো। প্রথমে গাউন, তারপর গ্লাভস, তারপর মাস্ক, সবশেষে আইশিল্ড। প্রবেশ করলাম ওয়ার্ডে। চারজনের ঘরে মা একা। একজন নার্স তাকে খাওয়ানোর চেষ্টা করছেন। এমনিতেই তার খাওয়ার প্রবৃত্তি কম। পিপিই পরে থাকা সত্ত্বেও মা দেখেই চিনতে পারলেন। খাওয়ানো শেষ করে নার্স চলে গেলেন।

 

 

এবার ঘরে কেবল আমরা দুজন। সব একদম চুপচাপ। মায়ের প্রতিটা শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। কতটা কাছে যাওয়া যাবে কি না, তাকে ধরা যাবে কি না, কিছুই জানি না। তাই এমনি সময়ে যেখানে বসতাম, সেখানেই বসলাম। কারা কারা মায়ের খোঁজ নিয়েছে সেসব বললাম। সবশেষে বললাম, ‘মা, তোমাকে ভালোবাসি।’

 

 

বের হওয়ার আগে লাগোয়া বাথরুমে গেলাম। ধারাবাহিকতা মেনে প্রথমে গ্লাভস খুলে জীবাণুমুক্ত করলাম। তারপর একে একে গাউন, আইশিল্ড আর মাস্ক। ভালো করে হাত ধুয়ে নিলাম। বের হয়ে জানতে পারলাম, রাতে মাকে অন্য ওয়ার্ডে নেওয়া হতে পারে।

 

 

বুধবার

পরদিন দুপুরে আবার গেলাম হাসপাতালে। মাকে নতুন ওয়ার্ডে নেওয়া হয়েছে। নতুন এক ডাক্তারের সঙ্গে কথা হলো। জানালেন, মায়ের নিউমোনিয়া ধরা পড়েছে। সে কারণেই নতুন ওয়ার্ডে নেওয়া হয়েছে। ফুসফুসের সংক্রমণ এড়াতে তাকে চতুর্থ মাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়েছে। অক্সিজেনের পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। তবে এখনো আইসিইউতে নেওয়া হয়নি। আপাতত এটুকুই চিকিৎসা। সুস্থ হতে কত দিন লাগবে তাও বলতে পারলেন না। নিজেকে খুব অসহায় লাগছিল। মাকে দিনের পর দিন এভাবে দেখতে হবে!

 

 

ডাক্তার-নার্সরা খুবই সহমর্মিতার সঙ্গে কথা বললেন। জানালেন, ঠিকমতো পিপিই ব্যবহার করতে পারলে সংক্রমণের কোনো ভয় নেই। এমনকি খোলার পর গোসল করা বা কাপড় ধোয়ারও প্রয়োজন নেই। কেবল হাত ধোয়ার ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে। শুনে বেশ আশ্বস্ত হলাম।

 

 

মায়ের নতুন ওয়ার্ডে গেলাম। এক শয্যার কক্ষ। টিভি আছে। মা টিভি দেখতে খুবই পছন্দ করেন। প্লাস্টিকের ব্যাগে করে ফোন নিয়েছিলাম। আমার ভাই মায়ের জন্য একটা ভিডিও পাঠিয়েছে। সেটাও দেখালাম। দুজনে মিলে দুপুর ১টার কভিড-১৯ সংবাদ সম্মেলন দেখলাম। হাসতে হাসতে মাকে বললাম, ‘বিখ্যাত হয়ে এখন কেমন লাগছে?’ শুনে মাও খুব হাসলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের কথা ফুরিয়ে গেল। বিদায় জানিয়ে বের হলাম।

 

 

বৃহস্পতিবার

সকাল সাড়ে ৯টায় হাসপাতালে ফোন দিলাম। ধরল না। একটু পরে ফোন এলো। জানাল, মায়ের অবস্থার উন্নতি হয়নি। শ্বাসকষ্ট আছে আগের মতোই। তবে জ্বর নেই। রক্তচাপ আর হৃদযন্ত্রের গতি স্বাভাবিক। অক্সিজেনের পরিমাণ আরেকটু বাড়ানো হতে পারে।

 

 

দুপুরে হাসপাতালে গেলাম। গেটে কড়াকড়ি আরো কমেছে। মানুষও বেড়েছে অনেক। গাড়ি পার্কিংয়ের তিন-চতুর্থাংশই ভর্তি। অন্য দিনের মতো মায়ের শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ আজ শোনা যাচ্ছে না। কারণ হাসপাতাল আগের মতো নিঃশব্দ নেই। মা টিভি দেখছিলেন। তাকে বাড়ির সব খবর দিলাম।

আমার যাওয়ার সময় হয়ে এলো। আড়াইটার দিকে গণস্বাস্থ্য বিভাগ থেকে ফোন এলো। আমার খবর নিয়ে মায়ের অবস্থারও খোঁজ নিল। কোনো কিছুতেই মন বসাতে পারলাম না।

 

 

শুক্রবার

সকাল সকাল হাসপাতালে গেলাম। নার্স আমাকে দেখেই মায়ের অবস্থা জানাল। সারা রাত ছটফট করেছে। সকালে নাশতা করেনি। গলায় আটকে যেতে পারে এই ভয়ে নার্সও ওষুধ খাওয়াননি। দ্রুত পিপিই পরে মায়ের ওয়ার্ডে গেলাম।

 

 

মা টিভি দেখছিলেন। চোখ নিষ্প্রভ। বেশির ভাগ কথারই উত্তর দিচ্ছিলেন না। কয়েকজন আত্মীয়কে ভিডিও কল দিলাম। মা সবাইকেই চিনলেন। কিন্তু কোনো কথা বললেন না। পানি খেতে চাইলেন।

 

 

আমার ভীষণ দুশ্চিন্তা হচ্ছিল। বের হতে যাব তখনই পিপিই পরা ডাক্তার ঢুকলেন। মাকে পরীক্ষা করলেন। তারপর দুজনে বের হয়ে এলাম। জানালেন, অবস্থা খুবই সঙ্গিন। শ্বাসকষ্ট অনেক বেড়ে গেছে। দুই ফুসফুসেই নিউমোনিয়া ছড়িয়ে পড়েছে। আইসিইউতে নিলেও বেঁচে ফেরার কোনো সম্ভাবনা নেই। তবু চেষ্টা করা যেতে পারে। অথবা প্যালিয়েটিভ কেয়ারে নেওয়া যেতে পারে। জীবনের শেষ মুহূর্ত যেন মা একটু কম কষ্ট পান, সেটা নিশ্চিত করতে অক্সিজেনের সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হবে। যাতে তার অনুভূতি ভোঁতা হয়ে যায়।

 

 

মায়ের কাছ থেকে শেষ বিদায় নিলাম। পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে কতক্ষণ লাগবে তার কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। ওদিকে আমি যত বেশি সময় থাকব, তত বেশি সংক্রমণের আশঙ্কা বাড়বে।

 

 

আড়াইটার দিকে হাসপাতাল থেকে ফোন এলো। প্যালিয়েটিভ কেয়ার শুরু হয়েছে। আমি প্রার্থনা শুরু করলাম, যেন দ্রুত মা যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পান। ৫টা ২৫ মিনিটে নার্স ফোন দিল। মিনিট পাঁচেক আগে মা চিরবিদায় নিয়েছেন।

 

 

পৃথিবীর দীর্ঘতম সপ্তাহ ফুরোল। একদিন হয়তো এই মহামারি শেষ হবে। কিন্তু রেখে যাবে ভয়ংকর সব স্মৃতি। আমার মায়ের স্মৃতির মতো। প্রতিদিনই শিকার হচ্ছে অসংখ্য মানুষ। আমার মায়ের মতো। তোমাকে অনেক ভালোবাসি মা।