প্রথমবার্তা, প্রতিবেদকঃ  বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকিতে রয়েছে বেশির ভাগ মানুষ। কারণ এটি এমন এক ছোঁয়াচে রোগ যে আপনি নিজে সচেতন হলেই হবে না, আপনার আশপাশের মানুষদেরও করোনা প্রতিরোধে সমান সচেতন ও সতর্ক হতে হবে।

 

কিন্তু সরকারের এত নির্দেশনা সত্ত্বেও বাজারে বা রাস্তায় বের হলেই মনে হচ্ছে, বাংলাদেশে কোনো করোনা নেই। গত ১৫ মে মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া ঘাটে জনসমাগম দেখে মনে হয়েছে ঈদের আগের দিন। হুড়োহুড়ি করে ফেরিতে কোনো রকমে মানুষ নিজের জায়গা করে নিয়েছে; এরপর গাদাগাদি করেই পার হয়েছে পদ্মা।

 

এ ছাড়া ঢাকার ফুটপাতে ক্রেতাদের ভিড় লক্ষণীয়। কার্যকর লকডাউন ছাড়া মানুষকে কোনোভাবে ঘরে রাখা যাবে না বলেই প্রতীয়মান হয়।সরকার সাধারণ ছুটি কয়েকবার বর্ধিত করেছে। কেন করেছে? কারণ যাতে মানুষ ঘরে থাকে। চাকরিজীবীরা ঘরে থাকলেও অন্য মানুষ রাস্তায় বের হচ্ছে। তাই তারা সচেতন হলেই হবে না।

 

বিশ্লেষকের মতে, মে মাসের শেষ সপ্তাহ করোনা সংক্রমণের পিক টাইম, তাই সরকারকে গভীরভাবে চিন্তা করে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় খুবই খারাপ পরিণতি হতে পারে। দেশে করোনায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর পাশাপাশি করোনাভাইরাসে মৃত্যুর সংখ্যাও দ্রুত বেড়ে চলেছে।

 

মাঝে মৃত্যুর সংখ্যা কিছুটা হ্রাস পেলেও এই সপ্তাহ থেকে সেটা আবার ঊর্ধ্বমুখী এবং ভবিষ্যতে তা আরো বৃদ্ধি পেতে পারে। টেস্ট ও শনাক্তের হার বিশ্লেষণ করলে তা উপলব্ধি করা যায়।১৫ মে ২৪ ঘণ্টায় আট হাজার ৫৮২টি নমুনা পরীক্ষা করা হয় এবং করোনায় সংক্রমিত হয় এক হাজার ২০২ জন।

 

এ ক্ষেত্রে করোনা শনাক্তের হার প্রায় ১৪ শতাংশ। বর্তমানে আমাদের জনসংখ্যা ১৬.৫২ কোটি, সুতরাং ১৪ শতাংশ হারে করোনায় আক্রান্তের আশঙ্কায় রয়েছে ২.৩১ কোটি মানুষ। আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা এত শক্তিশালী নয় যে এত রোগী সামাল দেওয়া বাংলাদেশের জন্য সহজ হবে।

 

আমাদের লকডাউন পলিসি তেমন কাজে দেয়নি। কারণ আমরা তো সচেতন নই। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী যেসব পদক্ষেপ নিয়েছেন, তা অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। একমাত্র প্রধানমন্ত্রী খুবই বিচক্ষণ ও সুদৃঢ় পরিকল্পনার সঙ্গে করোনা মোকাবেলায় কাজ করে যাচ্ছেন।

 

অন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো যদি অনুরূপ দক্ষতার সঙ্গে কাজ করত তাহলে আমাদের দেশের অবস্থা এ রকম না-ও হতে পারত। কিন্তু অন্যান্য দপ্তর কাজের তেমন কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারেনি।
দেশে ১৫ মে পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে ২৯৮ জন।

 

মূলত সংক্রমণ শুরুর দশম সপ্তাহে করোনায় আক্রান্ত মানুষ এবং মৃত্যুর সংখ্যা দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে। ১৫ মে পর্যন্ত দশম সপ্তাহের পাঁচ দিনের প্রতিদিনই মৃত্যুর সংখ্যা ১০-এর ওপরে ছিল, যা আগে দেখা যায়নি। এখন প্রতিদিন রোগী শনাক্ত আগের তুলনায় বেশি। গত পাঁচ দিনে পাঁচ হাজার ৪০৮ জন রোগী শনাক্ত করা হয়।

 

তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ৫০ ছাড়ায় ১৫ এপ্রিল, সংক্রমণ শনাক্তের ৩৯তম দিনে। ৪৫ দিনে এসে মৃত্যুর সংখ্যা পৌঁছায় ১০০-তে। পরবর্তী সাত দিনের ব্যবধানে মৃত্যুর সংখ্যা হয় ১৫০। এরপর মৃত্যু ১৫০ থেকে ২০০ ছাড়াতে সময় লেগেছে ১১ দিন। আর মৃত্যুর সংখ্যা ২০০ থেকে ২৮৩ হয়েছে মাত্র ছয় দিনে।

 

১৫ মে পর্যন্ত দেশে করোনায় মৃত্যুর হার প্রায় ১.৫ শতাংশ। প্রতিবেশী ভারত-পাকিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত মৃত্যুর হার কম। নেপাল, ভুটান ও মালদ্বীপের সঙ্গে তুলনা করলে আমাদের অবস্থা খারাপ। তবে ভারত ও পাকিস্তানে বাংলাদেশের চেয়ে আগে কভিড-১৯-এর সংক্রমণ শুরু হয়।

 

গণমাধ্যম থেকে জানতে পারি, ভারত ও পাকিস্তান ছাড়িয়ে মাত্র দুই মাসেই করোনাঝুঁকিতে বাংলাদেশ এখন ‘এশিয়ার হটস্পট’। এটা আমাদের জন্য মারাত্মক হুমকিতে পরিণত হয়েছে। কিছুদিন আগেই করোনাভাইরাস সংক্রমণে এশিয়ার হটস্পট ছিল পাকিস্তান। তারপর পাকিস্তানকে টপকে সেই স্থান দখল করে ভারত।

 

তবে বর্তমানে ভারত ও পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে শীর্ষস্থানে বাংলাদেশ। বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে করোনায় সংক্রমণের হার বাড়লেও পরীক্ষার হার এখনো অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক কম। তাই পিক টাইমে লকডাউন শিথিল করা কতটুকু ঠিক হয়েছে, তা নিয়ে মানুষের মনে প্রশ্ন ও ভয় রয়েছে। কার্যত বাংলাদেশে কখনো কিন্তু কার্যকর লকডাউন ছিল না।

 

দেশে লকডাউন নেই বলা যায়। গণপরিবহন ছাড়া সব ধরনের যানবাহনের দেখা মিলছে সড়কে। বাজারে কিংবা সব জায়গায় মানুষের আনাগোনা আগের মতো হয়ে যাচ্ছে। কাঁচাবাজারসহ ওষুধের দোকান তো আগেই খোলা ছিল, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অন্যান্য দোকানপাটও। বাজারে দেখা যাচ্ছে লোকজনের ভিড়। রাজধানীতে ফিরে এসেছে আগের চিরচেনা রূপ।

 

সড়কে শুরু হয়েছে যানজট। ফলে ক্রমেই খারাপের দিকে যাচ্ছে দেশের পরিস্থিতি। প্রথম মাসে দৈনিক আক্রান্তের সংখ্যা ৪০-৫০-এর ওপরে ওঠেনি। আর এখন প্রায় প্রতিদিনই করোনায় সংক্রমণের সংখ্যা হাজার বা হাজারের বেশি হচ্ছে।আমাদের দেশে বাজার যেভাবে গড়ে উঠছে, তা আমরা সবাই অবগত। আপনি নিজে ইচ্ছা করলেও সতর্ক থাকতে পারবেন না।

 

মানুষ শারীরিক দূরত্ব না মেনে আপনার কাছে এসে দাঁড়াবে। এটা করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। দোকানগুলোতে দেখা যাচ্ছে, মানুষ গায়ে গায়ে দাঁড়িয়ে বাজার করছে। নেই মাস্ক ও অন্যান্য স্বাস্থ্য সুরক্ষা সরঞ্জাম। বাজার সমস্যা সমাধানে তাই আমি মনে করি, ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির মতো সব এলাকায় বিকল্প বাজারব্যবস্থা চালু হলে মানুষ এই করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি থেকে রক্ষা পেত।

 

বিকল্প বাজারব্যবস্থায় ভ্রাম্যমাণ গাড়ি প্রতিদিন একবার প্রতিটি এলাকায় যেতে পারে। সময় আগেই থেকে নির্ধারিত করা থাকতে পারে, মানুষ ওই সময় অনুযায়ী প্রতিটি পরিবারকে ৫-১০ মিনিট সময় নির্দিষ্ট করে দেবে, তার মধ্যে বাজার শেষ করতে হবে। একসঙ্গে এক পরিবারকে বাজার করার সুযোগ দিতে হবে। এক পরিবারের শেষ হলে অন্য পরিবারের লোক বাজার করতে পারবে।

 

ভ্রাম্যমাণ গাড়িতে কাঁচাবাজার থেকে শুরু করে মুদির দোকানের সব পণ্য রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। এ ছাড়া অনলাইন সিস্টেম চালু করা যায়। যেমন—আগের দিন অনলাইনে অর্ডার দেবে এবং মোবাইল ফোন নম্বরসহ ঠিকানা দেবে। গাড়ি বাসার নিচে এসে কল দেবে অথবা বাঁশি বাজাবে।

গ্রাহক এসে বাজার নিয়ে যাবে; এবং এতে আরো সময় কম লাগবে। কারণ দ্রব্যাদি তো রাতে প্যাকেট করে রাখবে এবং সকালে শুধু গাড়িতে লোড করবে। এর বিনিময়ে কিছু সার্ভিস চার্জ নেবে। সরকার এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিলে দেশবাসী অনেক উপকৃত হবে এবং সেই সঙ্গে করোনার কমিউনিটি ট্রান্সমিশন কমে যাবে বলে বিশ্বাস করি।

 

যারা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের জন্য বাজারে যেত, এতে তাদের এখন আর যেতে হবে না। যদিও বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় কিছু জায়গায় ভ্যানে করে কাঁচাবাজার বিক্রি করে থাকে কিছু দোকানদার, কিন্তু তা সব জায়গায় নেই। এই সময়ে এ ধারণার সঠিক ও ব্যাপক বাস্তবায়ন দরকার।

 

সৌদি আরবে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা বেশি হলেও মৃত্যুর সংখ্যা কম। তার পরও করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে ঈদুল ফিতরের ছুটিতে সৌদি আরব জুড়ে ২৪ ঘণ্টার কারফিউ জারি করার খবর সংবাদপত্রে এসেছে। কারণ ঈদের সময় মানুষের চলাফেরা বেশি হওয়ার কথা। মানুষ এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ঘুরে বেড়ায়।

 

আমাদের দেশে সরকারি ছুটি ৩০ মে পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। সাধারণত ঈদের তিন দিন ছুটি থাকে। এ বছর আরো বেশি ছুটি ভোগ করবেন চাকরিজীবীরা।অন্য মুসলিম দেশ যেখানে কারফিউ দিতে পারে, আমরা তো সেখানে কার্যকর লকডাউন দিতে পারি।

 

ফলে রাস্তায় মানুষের সমাগম অনেক কমে যাবে, যা করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি থেকে আমাদের রক্ষা করতে পারে। কার্যকর লকডাউন নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচনা চলমান যে সরকার এই পদক্ষেপ নিলে হয়তো বা করোনা সংক্রমণের হার কমে যাবে। তাই সরকার ২০-৩০ তারিখ পর্যন্ত এ বিষয়ে ভেবে দেখতে পারে।

এমনিতেই ঈদের আগে ও পরে শিল্প-কারখানায় কাজ কম হয়ে থাকে। তাই অযথা জনসমাগম যাতে করোনার বিস্তার করতে না পারে সে জন্য এখনই চিন্তা-ভাবনা করে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে।

 

লেখক : পিএইচডি ফেলো, জংনান ইউনির্ভাসিটি অব ইকোনমিকস অ্যান্ড ল, উহান, চীন
এবং শিক্ষক, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ