প্রথমবার্তা, প্রতিবেদকঃ   ‘মাইক্রোবাসটি রূপনগর বেড়িবাঁধে ওঠার পরে প্রকৌশলী আনিছুর রহমান সেলিম ইশারা দেন প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেনের গলা চেপে ধরতে। সঙ্গে সঙ্গেই আমি গলায় রশি পেঁচিয়ে টান দিই।

 

তখন প্রকৌশলী সেলিমও দেলোয়ারকে চেপে ধরেন। দেলোয়ারের দেহ নিস্তেজ হয়ে গেলে উত্তরার ১৭ নম্বর সেক্টরের খালি প্লটে রাস্তার পাশে লাশ ফেলে দিই। তার ফোনটি ফেলে দেওয়া হয় পাশের লেকে।’

 

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেনকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তারের পর ভাড়াটে খুনি শাহীন এভাবেই পুলিশের কাছে ও আদালতে হত্যাকাণ্ডের বিবরণ দিয়েছেন।

 

ঘটনার পর থেকে প্রকৌশলী দেলোয়ারের কোনো খোঁজ পাচ্ছিল না পরিবার। গত ১১ মে বিকালে ৪টায় উত্তরা ১৭ নম্বর সেক্টরে ফাঁকা জায়গায় অজ্ঞাতনামা একটি মরদেহ পাওয়া যায়।

 

পরে ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ্যমে জানা যায় মৃত ব্যক্তি দেলােয়ার হােসেন (৫০) গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী (অঞ্চল-৭)।ওই ঘটনায় নিহতের স্ত্রী মােছা. খােদেজা আক্তার (৪২) বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের নামে তুরাগ থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।

 

মামলায় সহকর্মী সহকারী প্রকৌশলী সেলিম হোসেনসহ তিনজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এরপর উত্তরা বিভাগ পুলিশ জানায়, পূর্ব শত্রুতার জেরে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী খুন করা হয় প্রকৌশলী দেলোয়ারকে।

 

গ্রেফতাররা হলেন- গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সহকারী প্রকৌশলী সেলিম হোসেন, গাড়িচালক হাবিব ও ভাড়াটে খুনি শাহিন হাওলাদার।বৃহস্পতিবার (২১ মে) এসব তথ্য জানান ডিএমপির উত্তরা বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) কামরুজ্জামান সরদার।

 

তিনি জানান, প্রকৌশলী সেলিম জিজ্ঞাসাবাদে জানায়, ঘটনার দিন সকালে সে অসুস্থ থাকায় বাসাতেই অবস্থান করছিল। কিন্তু সে তার বাসার সঠিক ঠিকানা প্রদান না করে তার স্ত্রীকে অন্য একটি বাসায় গিয়ে অবস্থান করতে বলে।

 

পুলিশ সেই বাসার ঠিকানায় ব্যাপক খোঁজাখুঁজি করে এবং প্রযুক্তির সহায়তায় ঘটনার পূর্বের ও ঘটনার দিন সেলিমের অবস্থান করা ২০৬/১, পূর্ব কাফরুলের ঠিকানা বের করে পুলিশ।

 

বাড়ির সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনায় দেখা যায়, সকাল ৮টা ৪৬ মিনিটে সাদা পিপিই ও কালােজুতা পরিহিত একজন ওই বাড়ি থেকে বের হয়ে যাচ্ছেন। ওই ব্যক্তির ব্যবহৃত পিপিই, জুতা ও আকৃতির সাথে ঘটনায় জড়িত পিপিই পরিহিত ব্যক্তির হুবহু মিল পাওয়া যায়।

 

পরবর্তীতে প্রকৌশলী সেলিমকে ফুটেজটি দেখালে তিনি স্বীকার করেন, ওই ব্যক্তিই তিনি।ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি স্বীকার করেন যে, সুকৌশলে দেলােয়ার হােসেনকে খুন করা হয়। সহযোগী হিসেবে ভাড়াটে খুনি শাহীন এবং ড্রাইভার হাবিব হত্যায় অংশ নেয়।

 

পরবর্তীতে তার দেয়া তথ্যে এবং প্রযুক্তির সহায়তায় শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান পরিচালনা করে খুনি শাহীনকে পল্লবী লালমাটিয়া, বটতলা এলাকা থেকে এবং ঘটনায় ব্যবহৃত মাইক্রোবাসের চালক হাবিবকে ভাটারা হতে গ্রেফতার করা হয়।

 

জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, হত্যায় ব্যবহৃত হাইস গাড়িটি গােয়ালন্দ থানা এলাকায় থেকে উদ্ধার করা হয়। প্রকৌশলী সেলিম, ভাড়াটে খুনি শাহীন, চালক হাবিব ও গাড়ির মালিক হাসান নিশ্চিত করেন যে, ওই গাড়িটিই ঘটনার সময় ব্যবহার করা হয়েছিল।

 

পরে তাদের দেয়া তথ্যে, তুরাগ থানাধীন দিয়াবাড়ীসহ তিন নম্বর ব্রিজ সংলগ্ন লেক থেকে ফায়ার সার্ভিস এবং সিভিল ডিফেন্সের ডুবুরি দলের সহযােগিতায় নিহত প্রকৌশলী দেলােয়ার হােসেনের ব্যবহৃত মোবাইলফোন উদ্ধার করা হয়।

 

গ্রেফতারদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে কামরুজ্জামান সরদার বলেন, পূর্ব শত্রুতার জেরে প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেনকে হত্যা করা হয়েছে। দেলোয়ারকে গাড়িতে করে তুলে নেয়ার পর প্রকৌশলী সেলিম তার পাশে বসেন।

 

ভাড়াটে খুনি শাহিন দেলােয়ার হােসেনের ঠিক পেছনের সিটে বসেন এবং একপর্যায়ে আকস্মিকভাবে গলায় রশি পেঁচিয়ে টান দেন। এ সময় সেলিম নিজে ভিকটিমকে চেপে ধরেন।

 

হত্যার পর তারা সবাই মিলে দেলোয়ার হোসেনের মরদেহ উত্তরা ১৭ নম্বর সেক্টরে খালি প্লটে রাস্তার পাশে ফেলে দিয়ে পালিয়ে যান। সেলিমের সঙ্গে নিহত দেলোয়ার হোসেনের দীর্ঘদিনের মতানৈক্য ছিল, এর ফলে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী দেলোয়ারকে খুন করা হয়।

 

গ্রেফতারকৃতদের আদালতে পাঠানো হলে ভাড়াটে খুনি শাহীন ও চালক হাবিব ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারােক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন। আদালত আসামি প্রকৌশলী সেলিমকে পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।