প্রথমবার্তা, প্রতিবেদকঃ  রাজধানীর নীলক্ষেত-নিউ মার্কেট এলাকায় সারা দিন ত্রাণের অপেক্ষায় থাকেন ২৩ বছরের যুবক আজগর আলী। করোনা পরিস্থিতির আগে নীলক্ষেতে একটি কম্পিউটার ও স্পাইরাল বাইন্ডিং-এর দোকানে কাজ করতেন।সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর থেকে কাজ বন্ধ।

 

এখন মালিক মাঝে মধ্যে দোকান খুললেও কর্মচারীর প্রয়োজন হয় না। আর দিন চুক্তিতে কাজ করায় মালিকের কাছে বেতন-ভাতা বা ঈদ বোনাস দাবির সুযোগ নেই। তাই ত্রাণের খোঁজে দিন কেটে যায়। ঈদ আনন্দের কথা তার ভাবনার বাইরে।নীলক্ষেত এলাকার বই, কম্পিউটার, স্টেশনারী, হোটেলসহ অন্যান্য দোকানের দিন চুক্তি কাজ করা শ্রমিকরা এখন বেকার।

 

লকডাউনের পর থেকে বন্ধ আছে টেম্পু চলাচল। তাই হয়ে পড়েছেন নীলক্ষেত-ফার্মগেট রুটের টেম্পু হেলপার আজিজ কর্মহীন।আজিজ জানান, নিজে বিভিন্ন মানুষের দেওয়া সহায়তায় দিন পার করলেও রমজানে গাইবান্ধার সদ্যুল্লাপুরে থাকা মা-বাবার জন্য কিছুই পাঠাতে পারেননি।

 

জীবন-জীবিকার ওপর বিরক্ত এই দিনমজুরের কাছে ঈদ কেমন কাটবে জানতে চাইলে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কাজ নেই, তাই আয়ও নেই। আয় নেই, তাই ঠিকমতো খাবারও জোটে না। এরমধ্যে ঈদ হবে কীভাবে?ঈদের বিষয়ে কোনো আগ্রহ নেই গৃহকর্মী আছিয়া বেগমের। সারা দিন মোহাম্মদপুর চাঁন মিয়া হাউজিং-এর বাড়ি বাড়ি ঘুরে ঠিকা কাজ করতেন তিনি।

 

লকডাউনের পর থেকে হাউজিং-এর অধিকাংশ ভবনে গৃহকর্মীসহ বাইরের মানুষের যাতায়াত বন্ধ। ছুটি দীর্ঘ হওয়ায় ওই ভবনের অনেক পরিবার গৃহকর্মীদের বেতন চুকিয়ে কাজ থেকে ছাড়িয়ে দিয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে নতুন করে কাজ পাওয়ার সুযোগ নেই। আর কাজ না থাকায় মজুরি ও ঈদ বখশিসও নেই। ফলে ঈদের সেমাইয়ের জন্যও অন্যের কাছে হাত পাততে হবে।

 

আছিয়া জানান, তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে ওই এলাকার বিভিন্ন বাসায় কাজ করেন তিনি। মালিকরা ফোন করে বলে দিয়েছেন আর যেতে হবে না। মার্চ মাসের মজুরি পেলেও এখন আর কেউ খোঁজ নেয় না। এই অবস্থায় চার হাজার টাকা ঘর ভাড়া দিয়ে বাচ্চাদের নিয়ে দিন কাটানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

 

পরিবহন বন্ধ থাকায় গ্রামে ফিরে যাওয়ারও সুযোগ নেই। নতুন পোশাক তো দূরের কথা, ঈদের দিন বাচ্চাদের কী খাওয়াবেন সেটাই ভেবে পাচ্ছেন না তিনি।দিনমজুর হাফিজুল দুই সন্তানকে নিয়ে রায়ের বাজার পুলপাড়ের ছোট্ট টিনশেড ঘরে ভাড়া থাকেন। তিনি জানান, গত সপ্তাহে দুই দিন ছোট দুটো কাজ পেয়েছিলেন।

 

কিন্তু তাতে একদিনের খাবার হয়নি। স্ত্রী জেসমিন আক্তার অন্যের বাড়িতে ঠিকা কাজ করতেন। দুজনের আয়ে পাঁচজনের সংসার কষ্টেই চলতো। কিন্তু করোনার পরিস্থিতির কারণে দুজনই এখন কর্মহীন হয়ে পড়ায় প্রতিদিনের খাবার যোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়েছে। একটি সংস্থা থেকে কিছু চাল-ডাল পাওয়ায় কয়েকদিনের খাবার হয়।

 

কিন্তু আগামী দিনগুলোর কথা ভেবে এখন দুঃশ্চিন্তায় আছেন তিনি। তাদের দুঃশ্চিন্তা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে ঈদ।একই অবস্থা কুলি-মুটে, মেকানিক, নির্মাণ ও আবাসন শ্রমিক এবং মাটি কাটা, ইট-বালি পরিবহন, বাসা-বাড়ি পরিষ্কার, ইটভাটা, হোটেল, রেস্তোঁরা, পার্লার ও লোহা লক্করের কাজ করেন যারা।

 

তাদের বেশিরভাগই দৈনিক মজুরিতে কাজ করেন। সাধারণ ছুটি যত দীর্ঘ হচ্ছে ততই বাড়ছে তাদের অভাব ও শঙ্কা। যাদের নাম শ্রমিক হিসেবে সরকারের খাতায়ও নেই। দেশে মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৫ শতাংশই এ ধরনের অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজে নিয়োজিত। অনানুষ্ঠানিক খাতের বড় একটি অংশই দৈনিক, চুক্তিভিত্তিক মজুরি এবং নিয়োগপত্র ছাড়াই কাজ করেন।

 

এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য শ্রমিক কাজ করছেন মুদি কিংবা বিভিন্ন দোকানে। এছাড়া পরিবহন, বন্দর, নির্মাণ ও আবাসন এবং হাটবাজার শ্রমিক রয়েছেন। সব মিলিয়ে দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে সারা দেশে কাজ করেন প্রায় দুই কোটি শ্রমিক। যারা এখন কর্মহীন আছেন। তাই তাদের কাছে উৎসব বা আনন্দ নয়, কষ্ট ও বেদনা নিয়ে আসছে ঈদুল ফিতর।

 

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, আত্মকর্মসংস্থানে নিয়োজিত কিংবা পারিবারিক অর্থায়নে হেলপার হিসেবে যারা আছেন, তাদের শ্রমিক হিসেবে সরকারি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। বিশেষ করে নির্মাণ প্রক্রিয়ায় জড়িত রাজমিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রি, রডমিস্ত্রি, সুপারভাইজার, টেকনিশিয়ান, ইলেকট্রিশিয়ান, মেশিন অপারেটর ও হেলপার কিংবা শাটার মিস্ত্রিরা অধিকাংশই সাব-কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে কাজে যুক্ত হন। অস্থায়ী ভিত্তিতে কাজ করেন বলে তাদের কোনো নিয়োগপত্র থাকে না।

 

করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে তাদের প্রায় সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ আছে। ফলে বেকার সময় পার করছেন রাজধানীর নির্মাণ ও আবাসন খাতের প্রায় ৩৬ লাখ শ্রমিক।এছাড়া দেশের খুচরা ও পাইকারি পণ্যের দোকান এবং মোটর মেরামত খাতে নিয়োজিত রয়েছেন প্রায় ৮৬ লাখ ৫৫ হাজার শ্রমিক।

 

তাদের সিংহভাগই দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে কাজ করেন। এর মধ্যে মুদি, চায়ের দোকান ও মোটর শ্রমিক বেশি।দেশে বাস-মিনিবাস, ট্রাক-পিকআপ, অ্যাম্বুলেন্স, মাইক্রোবাস, প্রাইভেট কার, হিউম্যান হলারসহ বিভিন্ন ক্যাটাগরির যানবাহনে প্রত্যক্ষভাবে কাজ করেন এক বা একাধিক শ্রমিক।

 

একজন চালকের সঙ্গে একজন সুপারভাইজার ও একজন সহকারী থাকেন। পাশাপাশি টিকিট কাউন্টার পরিচালনা, রুট পরিচালনাসহ বিভিন্ন ধরনের কাজ করে থাকেন তারা।অন্যদিকে বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রায় ১২টি স্থলবন্দর রয়েছে। পরিবহন ও বন্দরগুলো বন্ধ থাকায় এই খাতের অধিকাংশ শ্রমিকের জীবন-জীবিকায় নেমে এসেছে অন্ধকার।

 

বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র (টিইউসি) সভাপতি শহীদুল্লাহ চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, করোনা পরিস্থিতিতে নিম্ন আয় ও খেটে খাওয়া মানুষদের অবস্থা শোচনীয় পর্যায়ে চলে এসেছে। স্বল্প মজুরির কারণে তাঁদের কোনো সঞ্চয় থাকে না। আর শ্রম আইনের বাইরে থাকায় ওইসব শ্রমজীবী মানুষদের কোনো প্রাপ্য আদায়ের সুযোগ নেই।

 

তাই শোষণের শিকার শ্রমজীবী মানুষগুলোর কাছে ঈদ উৎসব সবসময় কষ্টের। করোনা পরিস্থিতি তাদের কষ্ঠ আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। সরকার ওইসব মানুষের জন্য ঈদকে সামনে রেখে সহায়তার ঘোষণা দিলেও তা পাননি অধিকাংশ দিনমজুর।তবে ঈদের আগেই কর্মহীন শ্রমজীবী মানুষেরা সহায়তা পাবেন বলে আশা প্রকাশ করেছেন শ্রম প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ান।

 

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে রিকশা ও ভ্যানচালক, মোটর শ্রমিক, নির্মাণ শ্রমিক, পত্রিকার হকার, হোটেল শ্রমিকসহ অন্যান্য পেশার মানুষ, যারা দীর্ঘ ছুটিতে কাজ হারিয়েছেন এমন দিনমজুরদের তালিকা করা হয়েছে। ওই তালিকা অনুযায়ী অর্থ সহায়তা দেওয়া হবে। এজন্য ৭৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে বলেও তিনি জানান।

 

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘নিজেরা করি’র সমন্বয়কারী খুশী কবির কালের কণ্ঠকে বলেন, করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় পরিচালিত সব কার্যক্রমই বিচ্ছিন্নভাবে চলছে। এ কারণে কর্মহীন দিনমজুরদের কেউ কেউ একাধিকবার সহায়তা পাচ্ছেন। আবার অনেকেই কোনো সহায়তা পাননি। ঈদের আগের সহায়তার কথা বলা হলেও তা অধিকাংশ সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ এখনো পাননি।